দেশপ্রথম পাতাব্রেকিং নিউস

সিভিল সার্ভিসে উত্তীর্ণ মাদ্রাসা-ছাত্র মাওলানা শাহিদ এখন অনুপ্রেরণার অন্য নাম

আমি ইউপিএসসি পরীক্ষায় সফল হয়েছি, কারণ আমার আত্মবিশ্বাস ছিল। আর আমার মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে মাদ্রাসা। যিনি এই কথাগুলো বলেছেন, তিনি আর কেউ নন, ইউপিএসসির সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সফল মাওলানা শাহিদ রেজা খান। তিনি আরও জানাচ্ছেন, মাদ্রাসার মূল্যবোধের শিক্ষা আমার জীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। এখানেই আমি সিভিল সার্ভিসের ব্যাপারে জানতে পারি। ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসার ইচ্ছে মনে জাগে। মাদ্রাসা আমাকে দায়িত্ববান ও ধৈর্যশীল করে তুলেছে– যা আমার পরীক্ষার প্রস্তুতিতে খুব কাজ দিয়েছে।

শুক্রবার প্রকাশিত ইউপিএসসির ফলাফল থেকে জানা যাচ্ছে– এ বছর মোট ৭৫৯ জন সিভিল সার্ভিসে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। শাহিদেরর্ যাঙ্ক ৭৫১। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সফলদের আইএএস– আইপিএস– আইএফএস ইত্যাদি অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এবার ৩০ জন মুসলিম পড়ুয়া ইউপিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তৃতীয় হয়েছেন উত্তরপ্রদেশের জুনায়েদ আহমেদ।

দেশের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হিসেবে স্বীকৃত ইউপিএসসির সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা। এর পাঠক্রমের ব্যাপ্তি, পরীক্ষার্থীর অনুপাতে স্বল্পসংখ্যক নিয়োগ— সব মিলিয়ে অত্যন্ত শক্ত এই পরীক্ষায় পাশ করা দেশের অনেক তরুণেরই স্বপ্ন। কিন্তু মাদ্রাসায় পড়ে সেই স্বপ্ন সবাই দেখতে পারেন না। কারণ, এখনকার সাধারণ ধারণা ‘ওখানে কিছু হয় না’। মাদ্রাসা তাদের কাছে পিছিয়েপড়া শ্রেণির শিক্ষাস্থল। কিন্তু দেশের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটিতে নিজের নাম উত্তীর্ণদের দলে লিখিয়ে রীতিমতো নজির গড়লেন একদা মাদ্রাসা পড়ুয়া মাওলানা শাহিদ রেজা খান। আর এর ফলে তিনি এখন মাদ্রাসা পড়ুয়াদের কাছে হয়ে উঠেছেন জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

শাহিদের বাড়ি বিহারের গয়ার আমিনাবাদে। স্কুলজীবন কেটেছে গয়াতেই। সেখানকার স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ের মুবারকপুরের ‘মাদ্রাসা জামিয়াতুল আশরাফিয়া’তে ভর্তি হন। সেখান থেকে ‘আলিমিয়া’ ডিগ্রি পান। এই মাদ্রাসাকেই সাফল্যের কৃতিত্ব দিতে চাচ্ছেন শাহিদ। ‘মাদ্রাসায় কুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করেছিলাম। এতে আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। আর ইউপিএসসির প্রস্তুতির সময় এটাই আমাকে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে–’ জানাচ্ছেন তিনি।

মাদ্রাসায় পড়াশোনার পর দিল্লিতে যান এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ-তে ভর্তি হন ২০১১ সালে। আরবি ভাষা ও সাহিত্যে বিএ ও এমএ করেন তিনি।
তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য বিষয় পরিবর্তন করেন শাহিদ। ওয়েস্ট এশিয়ান স্টাডিজে এমফিল করেন। এখন পিএইচডিও করছেন একই বিষয়ে। সবই জেনএনইউতে। বছর-তিনেক পূর্বে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেল থেকেই হারিয়ে গিয়েছিেলন গবেষক নাজিব আহমেদ। শাহিদ ছিলেন তাঁর অন্যতম সাক্ষী। তখন নাজিবের খোঁজ পাওয়ার জন্য সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি শামিল হন। প্রেস কনফারেন্সও করেছেন। নাজিবের মা ফাতিমা নাফিসের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শাহিদ বলেছেন– এখনও যদি নাজিবের অন্তর্ধান-রহস্যের ব্যাপারে তাঁকে সিবিআই ডেকে পাঠায়– তিনি সমস্তরকম সাহায্য করবেন।

এমএ পড়তে পড়তেই ইউপিএসসি-র প্রস্তুতিশুরু করেন শাহিদ। ২০১৪ সালে পরীক্ষাতেও বসেন। কিন্তু সাফল্য আসেনি। তবে হাল ছেড়ে দেননি। তাই এবার সাফল্যের দুয়ার খুলে গেছে তাঁর জন্য। তিনি জানান– ‘২০১৪-১৫তে পার্সোনালিটি টেস্ট বা ইন্টারভিউতে আটকে যাওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য সময় দিই। ইউপিএসসির প্রস্তুতি বন্ধ রাখি। এর মধ্যে নেট-জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পাই। আর ২০১৮তে পরীক্ষা দিয়ে ৭৫১ র্যাঙ্ক করলাম। এর জন্য মহান আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ।’

ইউপিএসসি-র মেইনসে উর্দুকে অপশনাল হিসেবে নিয়েছিলেন শাহিদ। কারণ, এই ভাষাটি শাহিদ ভালো করে জানেন, কবিতাও লেখেন। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার কোচিং সেন্টার থেকে সিভিল সার্ভিসের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা শাহিদ বাড়ি থেকেও পেয়েছেন প্রভূত উৎসাহ। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ইলেকট্রিসিয়ানের ছেলে শাহিদ আব্বা-মা আর বড় ভাইকে বিশেষ কৃতিত্ব দিচ্ছেন এই সাফল্যের জন্য। পাশে থেকে আর্থিক ও মানসিকভাবে তাঁরা সবসময় সাহায্য করে গেছেন।
যাঁরা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসতে চান, তাঁদের উদ্দেশ্যে শাহিদের বার্তা, হাল ছেড়ো না। আত্মবিশ্বাস রাখো। এটা কঠিন নয়। আত্মবিশ্বাস থাকলেই তুমি যা চাইবে, সেটাই অর্জন করতে পারবে। দৃঢ়তা আর ধারাবাহিক পরিশ্রমই তোমাকে সাফল্যের দুয়ারে পৌঁছে দেবে।

Show More

Related Articles

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker
WhatsApp us