দেশপ্রথম পাতাব্রেকিং নিউস

দাড়িভিট স্কুলে অাসলে কী ঘটেছিল: ভাইরাল ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট

রিপোর্টটি সুনির্দিষ্ট এবং অকাট্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে লেখা। নিয়োগপত্র, সাবজেক্ট কনভার্সন বিষয়ক সরকারি দস্তাবেজ, স্কুল রেজলিউশন, ছাত্রছাত্রীদের এডমিট কার্ড, স্কুলের সাথে যুক্ত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের বক্তব্যের অডিয়ো এবং ভিডিয়ো রেকর্ডিং সহ একাধিক তথ্যপ্রমাণ লেখকের কাছে মজুদ রয়েছে––মুহাম্মদ জিম নওয়াজ।

দাড়িভিট স্কুলে গুলি চালনার ঘটনায় দু’জন ছাত্র নিহত হয়েছে। অাহত হয়েছে সাধারণ মানুষ, ছাত্রছাত্রী, পুলিশকর্মী।

ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের উপর গুলি কে বা কারা চালিয়েছিল, এই রিপোর্টে সুনির্দিষ্টভাবে সেই তথ্য উঠে আসেনি। সেটা পুলিশ প্রশাসনের তদন্তের বিষয়। রিপোর্টে মূলত নির্দিষ্ট শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতা এবং ছাত্র বিক্ষোভ বিষয়ক বিভ্রান্তিকর খবরগুলিকে নস্যাৎ করে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আসল ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

পশ্চিমবাংলার উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত বিহার লাগোয়া ইসলামপুর মহকুমা। ১৯৫৬ সাল অর্থাৎ ভারতের রাজ্য পুনর্গঠনের আগে অঞ্চলটি ছিল বিহারের অন্তর্গত। ১৯৫৩ সালে গঠিত স্টেট রি-অর্গানাইজেশান কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৫৬ সালে ইসলামপুর মহকুমাকে পশ্চিমবাংলার সাথে যুক্ত করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই, মহকুমার একটি বড় অংশের মানুষ অবাঙালি। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার আদি বাসিন্দাদের সূর্যপুরী বলা হয়। সেখানকার সূর্যপুরী মুসলিমদের শিক্ষার মূল মাধ্যম উর্দু এবং হিন্দি। তবে বর্তমানে অনেকেই বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে। স্বাভাবিকভাবেই, ইসলামপুর এবং সংলগ্ন এলাকার সরকার স্পনসর্ড এবং সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে একাধিক মাধ্যমে(বাই লিঙ্গুয়াল বা মাল্টি লিঙ্গুয়াল মিডিয়াম) পড়াশোনা হয়। ইসলামপুরের পন্ডিতপোতা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত দাড়িভিট হাইস্কুলটি এরকমই একটি একাধিক মাধ্যমের স্কুল।

দাড়িভিট স্কুল সংলগ্ন এলাকাটি মূলত হিন্দু অধ্যুষিত। এই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা ওপার বাংলা থেকে আসা শরণার্থী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য পন্ডিতপোতায় মুসলিমদের জায়গার উপর বিশাল একটি শিবির তৈরি হয়। এনিয়ে মুসলিমরা কখনই আপত্তি করেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও সেই শিবিরের মানুষরা আর সেখানেফিরে যাননি। পন্ডিতপোতাতেই থেকে যান। পন্ডিতপোতা বাজারের আশেপাশের প্রায় সব গ্রামগুলিই মুসলিম অধ্যুষিত।

গত ২০শে সেপ্টেম্বর, পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী উর্দু এবং সংস্কৃত শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্কুল চত্বরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ পৌঁছয়। জমায়েতকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠি চার্জ করে। কাঁদানেগ্যাসের সেল ফাটায়। শুরু হয় ইটবৃষ্টি, পেটোবোমা এবং গোলাগুলি ছোঁড়া। ঘটনায় রাজেশ সরকার এবং তাপস বর্মণ নামে দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশকর্মী, ছাত্রছাত্রী সহ আহত বেশ কয়েকজন।সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যালমাধ্যমে দ্রুত খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং অরাজনৈতিক সংগঠন পথে নামে। সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মাধ্যমে প্রচারিত খবর অনুযায়ী,

১) ছাত্রছাত্রী বাংলা শিক্ষক নিয়োগের পক্ষে আন্দোলন করছিল। কারণ, সার্ভিস কমিশন বাংলা শিক্ষক না পাঠিয়ে উর্দু এবং সংস্কৃত শিক্ষক পাঠিয়েছে।

২) স্কুলে উর্দু এবং সংস্কৃত শিক্ষকের ভ্যাকান্সি ছিল না, অথচ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের পাঠানো হয়েছে। ভ্যাকান্সি ছিল না, প্রমাণ হিসেবে ১৮/০৯/২০১৮ তারিখে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সাক্ষর করা একটি চিঠি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। চিঠিটি ম্যানেজিং কমিটির পক্ষ থেকে ডি আই-কে দেওয়া হয়েছিল।

৩) ভ্যাকান্সি না থাকলেও সার্ভিস কমিশনের সুপারিশ করা দুই শিক্ষক বিশাল পুলিশ বাহিনী সাথে নিয়ে স্কুলে জয়েন করতে আসে। এবিষয়ে ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ করে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের উপর পুলিশ গুলি করে। ফলে দুজন নিরীহ ছাত্রের মৃত্যু হয়। মৃতদেরপ্রারম্ভিক পর্যায়ে স্কুলের ছাত্র বলে প্রচারিত হলেও পরে প্রাক্তন ছাত্র বলা হয়।

৪) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সংগঠন ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের(সিবিআই, বিচার বিভাগীয়) তদন্ত চেয়ে পথে নামে।

৫) ঘটনার জেরে উত্তর দিনাজপুরের ডি আই রবীন্দ্র কুমার মন্ডলকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

৬) উত্তর দিনাজপুর জেলার এস পি সুমিত কুমার দাবী করেছেন, পুলিশ গুলি করেনি। পুলিশের গুলির হিসেব করে দেখা গেছে, পুলিশ একটিও গুলি করেনি। দুষ্কৃতিদের গুলিতেই দুজন মারা গেছে।
৭) ইতালি থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পুলিশের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়নি। ঘটনার পেছনে বিজেপি এবং আর এস এস-এর হাত রয়েছে।অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এবার প্রকৃত ঘটনা দেখে নেওয়া যাকঃ

 

মূল বিষয়ের উপর বিশ্লেষণ করার আগে বলে নেওয়া ভালো, উত্তেজনার আসল কারণ যেহেতু উর্দু এবং সংস্কৃত ঢালমাত্র, তাই এই রিপোর্টে উর্দু শিক্ষক নিয়োগ এবং পরবর্তী উত্তেজনার বিষয়ে প্রমাণ সহ আলোকপাত করা হয়েছে।

উপরেই উল্লেখ করেছি, দাড়িভিট হাইস্কুলটি শুধুমাত্র বাংলা মাধ্যম নয়। একই ছাদের তলায় উর্দু মাধ্যম স্কুলটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই রয়েছে। কিন্তু উর্দু শিক্ষকের অভাবে উর্দু মাধ্যমের পঠনপাঠন বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার ছাত্রীর মধ্যে প্রায় ১৫০জন মুসলিম ছাত্রছাত্রী বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনা করে।

২০০৭ সালে দাড়িভিট স্কুলটি জুনিয়ার স্কুল থেকে হাইস্কুলে উন্নীত হয়। তৎকালীনসময়ে পার্শ্ববর্তী মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামের সূর্যপুরী মানুষ(ইসলামপুরের আদি বাসিন্দাদের সূর্যপুরী বলা হয়), যাঁদের পরিবারের ছেলেমেয়রা মূলত উর্দু ভাষায় পড়াশুনা করে তাঁরাস্কুলের প্রধানশিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটির কাছে আবেদন করেন, যেহেতু উর্দু শিক্ষকের অভাবে তাদের ছেলেমেয়েরা এই স্কুলে পড়াশুনা করার সুযোগ পাচ্ছে না, সেহেতু ছেলেমেয়েদের প্রায় পাঁচ থেকে আট-দশ কিমি দূরে মনিভিটা বা অন্যান্য স্কুলে যেতে হয়। দূরত্ব বেশি হওয়ার কারণে অনেকেই পড়াশুনা ছেড়ে দেয়। তাই স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক আসার আগে উর্দু ভাষার অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ করার আবেদন করা হয়।

গ্রামবাসীদের আবেদনে প্রধানশিক্ষক এবং স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি সম্মতি জানায়। এই মর্মে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি ০৭/০৬/২০০৮ তারিখ শনিবার বেলা ১টার সময় স্কুল সভাপতি যতীন বিশ্বাসের সভাপতিত্বে একটি মিটিং-এর আয়োজন করে।সেই মিটিং-এ রেজোলিউশন পাশ করা হয়। ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠনের কথা ভেবে আটজন শিক্ষক শিক্ষিকা নেওয়া হয়। এদের মধ্যে মোহাঃ সাজ্জাদ হোসেনকে উর্দু শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই উর্দু মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা আবার স্কুলে ভর্তি হয় এবং পঠনপাঠন শুরু করে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত উর্দু মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৮০ জন হয়। এমনকী, ২০১৪ সালে দাড়িভিট হাইস্কুলের কিছু ছাত্র উর্দু মাধ্যমে মাধ্যমিক পরীক্ষাও দেয়। উল্লেখ্য, উল্লেখিত তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমার হাতে ২০০৮ সালে তৈরি স্কুলের রেজোলিউশন এবং স্কুল থেকে উর্দু মাধ্যমে মাধ্যমিক দেওয়া কিছু ছাত্রের রেজেস্ট্রেশন এবং এডমিট কার্ড রয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশতঃ উর্দু শিক্ষক মোহাঃ সাজ্জাদ হোসেন ভাইরাস ঘটিত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হন। ৭২ দিন কোমায় থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই উর্দু শিক্ষকের অভাবে উর্দু মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠন বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে স্কুলের প্রধানশিক্ষক অভিজিৎ কুণ্ডু ছাত্রছাত্রীদের টিসি(ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) নিয়ে অন্য স্কুলে চলে যেতে বলেন। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী প্রধানশিক্ষকের পরামর্শ মেনে টিসি নিয়ে স্কুল ছেড়ে চলে যায়। কয়েকমাস পরে সুস্থ হলে সাজ্জাদ সাহেব পুনরায় স্কুলে যুক্ত হন। উর্দু মাধ্যমের ছাত্রছাত্রী না থাকার কারণে প্রধানশিক্ষক তাঁকে হিন্দি পড়ানোর আদেশ করেন। এবং তিনি বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের হিন্দি পড়াতে শুরু করেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ২০১২-১৩ সালে বাংলা মাধ্যমের সাথে সাথে আলাদাভাবে শুধুমাত্র উর্দু মাধ্যমের জন্য পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ করতে প্রধানশিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটি ভ্যাকান্সি স্টেটমেন্ট বা পিপি(প্রায়র পার্মিশন) তৈরি করে তিন কপি ডি আই অফিসে জমা করে। পরবর্তীতে, ০৭/০২/২০১৮ সালে ম্যানেজিং কমিটি রেজোলিউশন পাশ করে এবং ফ্রেশ ভ্যাকান্সি স্টেটমেন্ট তৈরি করে ডি আই অফিসে জমা করে। ম্যানেজিং কমিটির মিটিং নম্বর ৩৩৪ এবং রেজোলিউশন নম্বর ০২। সেই অনুযায়ী ২৬/০৭/২০১৮ তারিখে স্কুল সার্ভিস কমিশন উর্দু মাধ্যমের জন্য দুজন উর্দু ভাষার এবং বাংলা মাধ্যমের জন্য একজন সংস্কৃত শিক্ষককে দাড়িভিট হাইস্কুলে চাকুরির সুপারিশ করে। তিনজন শিক্ষকের মধ্যে একজন দুজন এইচ এস সেকশনের জন্য এবং অন্যজনকে উর্দু মাধ্যমের মাধ্যমিক সেকশন(নবম ও দশম)-এর জন্য সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ কোলকাতার ইকবালপুরের বাসিন্দা মোহাঃ সানাউল্লাহ রাহমানীকে পিজি অর্থাৎ এইচ এস সেকশনের জন্য নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। সেইসাথে বাংলা মাধ্যমের এইচ এস সেকশনের জন্য সংস্কৃত শিক্ষক তোরাংগ মল্লিককে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। যেহেতু মাধ্যমিক সেকশনের জন্য সেই সময় পর্যন্ত কোনোও বিষয়েই নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়নি, তাই সুপারিশ পেলেও অন্যজন নিয়োগপত্র পাননি। এখন প্রশ্ন হল,

অনুমোদনপ্রাপ্ত উর্দু মাধ্যমের জন্য উর্দু শিক্ষককে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। তাহলে উর্দু শিক্ষক নিয়োগের বিরুদ্ধে বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের তুমুল বিক্ষোভের কারণ কী? বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের জোর করে উর্দু পড়ানোর জন্য তো আর উর্দু শিক্ষককে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি, উর্দু মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের উর্দু পড়ানোর জন্যই উর্দু শিক্ষকদেরসুপারিশ এবং নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। পাল্টা প্রশ্ন হতেই পারে, স্কুলে বাংলা এবং অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকের অভাব রয়েছে, অথচ উর্দু শিক্ষক কেন পাঠানো হয়েছে?
হ্যাঁ, আইন আদালত সহ নানান কারণে বিভিন্ন স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। দাড়িভিট স্কুলটিও ব্যতিক্রম নয়। একই যুক্তিতে বলা যেতে পারে, স্কুলটি উর্দু মাধ্যমে অনুমোদন প্রাপ্ত হলেও একজন অস্থায়ী উর্দু শিক্ষক ছাড়া আর কোনো উর্দু মাধ্যমের শিক্ষক নেই। অতএব, বাংলা মাধ্যমের সাথে সাথে উর্দু মাধ্যমের শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। সেক্ষেত্রে পাঁচজনের মধ্যে মাত্র দুজন শিক্ষকের সুপারিশ করা হয়েছে যা পর্যাপ্ত নয়। এরপরেও উর্দু মাধ্যমের শিক্ষক নিয়োগ হতে না দেওয়ার জন্য বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের কথিত আন্দোলন সম্পূর্ণ অর্থহীন অথবা কু-উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই উদ্দেশ্যের পেছনে স্কুলের আভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত শক্তি কাজ করেছে।

উর্দু শিক্ষক মোহাঃ সানাউল্লাহ রাহমানীর সুপারিশ এবং নিয়োগপত্র কি বৈধ ছিল?
ওয়েস্ট বেঙ্গল সেন্ট্রাল স্কুল সার্ভিস কমিশন প্রকাশিত প্যানেল এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের নিয়োগপত্র খতিয়ে দেখার পরে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হয়েছি যে, শিক্ষক সানাউল্লাহ-র সুপারিশ ও নিয়োগপত্র সম্পূর্ণ বৈধ ছিল এবং সঠিক পদ্ধতি মেনেই হয়েছে। স্কুল সার্ভিস কমিশন প্রকাশিত ফাইনাল মেরিট লিস্টে উর্দু মাধ্যমের উর্দু ভাষার জন্য জেনারেল পিজি ক্যাটাগরিতে তিনি ছয়তম স্থান দখল করেন। কাউন্সিলিং-এর সময় সানাউল্লাহ দাড়িভিট হাইস্কুল পছন্দ করেন। সেই অনুযায়ী, ১৩/০৯/২০১৮ তারিখে ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন নিয়োগপত্র দেয়(চিত্রঃ 4)। নিয়োগপত্রে উল্লেখিত মেমো নম্বরঃ WBBSE/App./UDJ/URDU-(PG)/AT-0223 এবং ২৬/০৭/২০১৮ তারিখে ওয়েস্ট বেঙ্গল স্কুল সেন্ট্রাল সার্ভিস কমিশনের সুপারিশ করা মেমো নম্বরঃ 5/6913/AT(PG)-URDU/CSSC/ESTT/2018.

এবার, নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার দিন অর্থাৎ ১৩/০৯/২০১৮ থেকে নিয়োগের দিন অর্থাৎ ২০/০৯/২০১৮ তারিখের আগের সময় পর্যন্ত ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করা যাকঃ
অত্যন্ত গরীব ঘরের সন্তান সানাউল্লাহ ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন থেকে নিয়োগপত্র জোগাড় করে ইসলামপুরের উদ্দেশ্যে রাতের ট্রেনেই রওনা দেন। ছেলে চাকুরি পেয়েছে, ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্বা মোহাঃ বসির সহ পরিবারের সকলেই অত্যন্ত খুশি ছিলেন। যাইহোক, ১৪/০৯/২০১৮ তারিখে সমস্ত ডকুমেন্টস নিয়ে তিনি স্কুলে পৌঁছে যান। কথা বলেন, প্রধানশিক্ষক অভিজিৎ কুণ্ডু এবং ম্যানেজিং কমিটির পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে। স্কুলের তরফ থেকে সানাউল্লাহকে জানানো হয়, আজ টেকনিক্যাল কিছু কারণে জয়েনিং করানো যাবে না। কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, এইচ এস সেকশনে যেহেতু এখনো উর্দু পড়ানোর অনুমতি পাওয়া যায়নি, তাই ডি আই অফিসে সমস্ত ডকুমেন্টস পাঠিয়ে সাবজেক্ট কনভার্সন করার পরে আপনার জয়েনিং হবে। সানাউল্লাহ বলেন, “নিয়োগপত্র অনুযায়ী ১৫দিনের ভিতর জয়েন করতে হবে। ২৭ তারিখ সময়সীমা শেষ। আমি তাহলে কবে আসবো স্যর?”

প্রধানশিক্ষক অনেক ভেবেচিন্তে ২০শে সেপ্টেম্বর আসতে বলেন। খবরাখবর নেওয়ার জন্য ১৮ই সেপ্টেম্বর তিনি আবার স্কুলে যান। প্রধানশিক্ষক জানান, আপনার সমস্ত ডকুমেন্টস তৈরি হয়ে গেছে। বেলা ১টা নাগাদ স্কুলের ক্লার্ক ডি আই অফিসে যাওয়ার জন্য রওনা দেন। প্রধানশিক্ষক ক্লার্কের সাথে সানাউল্লাহকেও ডি আই অফিসে যেতে বলেন। স্কুলের ক্লার্ক এবং সানাউল্লাহ দুজনে ডি আই অফিস রায়গঞ্জের কর্ণজোড়ায় পৌঁছে যান। অফিসে ডি আই উপস্থিত ছিলেন না। সেদিন তিনি ইসলামপুরে গিয়েছিলেন। সহকারী ডি আই, রউফ সাহেব ডকুমেন্টস রিসিভ করেন। রায়গঞ্জ থেকে ফেরার পথে জানতে পারেন, উর্দু এবং সংস্কৃত শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্কুলে তুমুল ঝামেলা শুরু হয়েছে। ছাত্রছাত্রী এবং স্থানীয় কিছু মানুষ প্রধানশিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ইসলামপুরে অবস্থানরত ডি আই ঝামেলার কথা জানতে পারেন এবং স্কুলে পৌঁছে যান। ডি আই-কেও ঘিরে ধরা হয়। বলা হয়, এইচ এস সেকশন থেকে উর্দু এবং সংস্কৃত পদ বাতিল করতে। নিয়মকানুন অনেক বোঝানোর পরেও অবরোধকারীরা কোনো কথাতেই কান দিতে অস্বীকার করেন। ম্যানেজিং কমিটি স্কুলের প্যাডে সমস্ত সদস্যদের সই নিয়ে উর্দু এবং সংস্কৃত পদ বাতিলের জন্য ডি আই-এর হাতে একটি চিঠি জমা করে।

ঝামেলার বিষয়টি জানার পরে, ১৯শে সেপ্টেম্বর প্রধানশিক্ষক অভিজিৎ কুণ্ডুকে সানাউল্লাহ ফোন করে বলেন,
“স্যর, জয়েন করা নিয়ে যদি সমস্যা হয় তাহলে আপনি আমায় রিফিউজাল লেটার দিন। গরীবের ছেলে। চাকুরিটা হারাতে চাই না। আপনি রিফিউজাল লেটার দিলে আমি অন্য স্কুলে জয়েন করানোর জন্য আবেদন করবো।“

প্রধানশিক্ষক বলেন, “আপনি এসএসসি থেকে এসেছেন। আপনাকে কি রিফিউজাল লেটার দিতে পারি? সেই এক্তিয়ার আমাদের নেই। আমার নিজের চাকুরি চলে যাবে। আপনি চিন্তা করবেন না, আমার সাথে ডি আই-এর কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, পদ্ধতি মেনেই আপনার নিয়োগ হবে। আজকেই হয়তো সাবজেক্ট কনভার্সন হয়ে যাবে। আমি ডি আই অফিস থেকে কনফার্মেশন মেইল পেলেই আপনাকে জানিয়ে দেবো।“

কনফার্মেশন মেইল পাওয়ার পরে রাত দশটার সময় প্রধান শিক্ষক সানাউল্লাহকে আগামীকাল অর্থাৎ ২০শে সেপ্টেম্বর স্কুলে গিয়ে জয়েন করতে বলেন। উল্লেখ্য, সাবজেক্ট কনভার্সনের জন্য স্কুলের পক্ষ থেকে ১৫/০৯/২০১৮ তারিখে আবেদনপত্র তৈরি করা হয়েছিল।সাবজেক্ট কনভার্সন হয় ১৯/০৯/২০১৮ তারিখে। (চিত্রঃ 5)

প্রশ্ন উঠতেই পারে, সাবজেক্ট কনভার্সন হয়নি, অথচ সাবজেক্টের জন্য সুপারিশ এবং নিয়োগপত্র পেল কীভাবে? এটা কি সম্ভব?

হ্যাঁ, সম্ভব। আপগ্রেডেশন ভ্যাকান্সির ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর। যেহেতু ০৭/০২/২০১৮ তারিখের স্কুল ম্যানেজিং কমিটির রেজোলিউশন এবং ফ্রেস পিপি অনুযায়ী উর্দু মাধ্যমে এইচ এস সেকশনের জন্য শিক্ষক চাওয়া হয়েছিল, তাই সার্ভিস কমিশন শিক্ষকের সুপারিশ করেছে এবং সেকেন্ডারি বোর্ড নিয়োগপত্র দিয়েছে। শিক্ষকের অভাবে এইচ এস সেকশন চালু করা যায়নি। এখন শিক্ষক এসেছেন। সেই শিক্ষকের নিয়োগপত্র যুক্ত করে সাবজেক্ট কনভার্সনের জন্য আবেদন করা যায় এবং অনুমতি পাওয়া যায়। এমনকী সাবজেক্ট কনভার্সনের আগেও নিয়োগ সম্ভব। সেক্ষত্রে ডি আই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের এপ্রুভাল লেটারে এডিশনাল শিক্ষক(টেম্পোরারি) শব্দটি যুক্ত করে দেন।

১৮/০৯/২০১৮ তারিখে উর্দু এবং সংস্কৃত শিক্ষকের পদ বাতিলের আবেদন করে ডি আই-কে ম্যানেজিং কমিটির দেওয়া চিঠির বৈধতাঃ

প্রথমসারির বিভিন্ন পত্রিকা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় উল্লেখিত চিঠিটি ব্যাপকভাবে সার্কুলেট করে প্রমাণ করার প্রচেষ্টা হয়েছে, দাড়িভিট স্কুলের এইচ এস সেকশনে আসলে কোনও ভ্যাকান্সিই ছিল না। যখন ভ্যাকান্সি ছিলই না, তখন সুপারিশ এবং নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে কিসের ভিত্তিতে? এই প্রশ্নের উত্তর উপরেই রয়েছে। এরপরেও বিষয়টি নিয়ে একটুখানি বলে নেওয়া যাকঃ

শিক্ষক চেয়েছিল তাই সার্ভিস কমিশন২৬/০৭/২০১৮ তারিখে উর্দু মাধ্যমের জন্য উর্দু শিক্ষক সানাউল্লাহকে সুপারিশ করে। সেকেন্ডারি বোর্ড থেকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে ১৩/০৯/২০১৮ তারিখে। সাবজেক্ট কনভার্সনের জন্য স্কুলের তরফে আবেদনপত্র লেখা হয়েছে ১৫/০৯/২০১৮ তারিখে। এখন প্রশ্ন হল, এরপরেও ম্যানেজিং কমিটি কেন ১৮/০৯/২০১৮ তারিখে সাবজেক্ট বাতিলের জন্য চিঠি লিখেছিল?এই প্রশ্নের উত্তরও উপরেই দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ম্যানেজিং কমিটির কিছু সদস্য স্বেচ্ছায় সই করেন এবং কিছু সদস্যকে সই করতে বাধ্য করা হয়।

দ্বিতীয়ত, একাধিক স্কুলের অভিজ্ঞ প্রধানশিক্ষক এবং পরিচিত শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকদের সাথে কথা বলে জেনেছি, সুপারিশ এবং নিয়োগপত্র দেওয়ার পরে পোস্ট বাতিল করার জন্য স্কুল কখনই আবেদন করতে পারে না। এমনকী, সেই ক্ষমতা ডি আই-এরও নেই। তাহলে কি ভুল পিপি বাতিল করা যাবে না? হ্যাঁ, যাবে। তবে সুপারিশ এবং নিয়োগের আগে ম্যানেজিং কমিটির মিটিং-এ উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে রেজোলিউশন পাশ করাতে হবে এবং নতুন পিপি দাখিল করতে হবে। এক্ষত্রে সেই পদ্ধতি মানা হয়নি। অতএব বহুল সার্কুলেট হওয়া চিঠিটি মূল্যহীন।

২০ তারিখ শিক্ষক নিয়োগ এবং রক্তক্ষয়ী গন্ডগোলের বিবরণঃ

প্রধানশিক্ষক অভিজিৎ কুণ্ডুর কথায় উর্দু শিক্ষক সানাউল্লাহ এবং সংস্কৃত শিক্ষক দুজনে দাড়িভিট হাইস্কুলে বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ পৌঁছে যান। বেলা প্রায় ১ টা ১০ মিনিট নাগাদ দুজনেই জয়েন করেন (চিত্রঃ 6)। জয়েন করার পরে, প্রধানশিক্ষক, ক্লার্ক, এবং আরও দু-তিনজন শিক্ষকের সাথে তাঁরা প্রধানশিক্ষকের অফিস থেকে স্টাফরুমে যান। ততক্ষণে স্কুলে টিফিনের সময় হয়ে গেছে। স্টাফরুমে যাওয়ার পরে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন, স্টাফরুমে একজন শিক্ষকও উপস্থিত নেই। শুধু শিক্ষক উপস্থিত নেই তা নয়, শিক্ষকদের ব্যাগপত্রও নেই। বিস্ময় কেটে উঠার আগেই লক্ষ্য করেন, বেশকিছু ছাত্রছাত্রী লাঠি, শাবল, হেঁসো, ছুরি নিয়ে স্টাফরুমে ঢুকে পড়েছে। সশস্ত্র ছাত্রছাত্রীরাসদ্য নিযুক্ত দুই শিক্ষক এবং তাঁদের সাথে থাকা প্রধানশিক্ষক সহ অন্যদের ঘিরে ধরে। অস্ত্র উঁচিয়ে দুই শিক্ষককে সাদা কাগজে সই করতে নির্দেশ দেয়। প্রধানশিক্ষক এবং সাথে থাকা অন্যরা ছাত্রছাত্রীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। সকলেই ব্যর্থ হন। ছাত্রছাত্রীদের ভয়ানক মূর্তি দেখে প্রধানশিক্ষক হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দেন। একই সাথে উর্দু শিক্ষক এবং সংস্কৃত শিক্ষকও কাঁদতে শুরু করেন। ছাত্রছাত্রীরা অকথ্য ভাষায় গালাগালিও করতে থাকে।

এরপর উর্দু শিক্ষক সানাউল্লাহ ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধ করেন,“বাবু, কী লিখতে হবে তোমরাই বলে দাও। সাদা কাগজে সই করিওনা। তোমার যা লিখতে বলবে, আমি সেটাই লিখে দেবো।“ সশস্ত্র ছাত্রছাত্রী বলে, “লিখুন, এই স্কুলে আমাদের সাবজেক্টের ভ্যাকান্সি নেই, তাই আমরা স্বেচ্ছায় রিজাইন দিচ্ছি।“
ছাত্রছাত্রীদের নির্দেশমতো সদ্য নিযুক্ত দুজন শিক্ষকই রিজাইন লেটার লিখতে শুরু করেন। উর্দু শিক্ষক ইংরেজিতে লেখা চিঠিতে ছাত্রছাত্রীদের নির্দেশিত কথাগুলি লেখেন। তবে তিনি বয়ানের সাথে ‘Under Pressure’ শব্দদুটি জুড়ে দেন। চিঠি লিখে ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দেওয়ার পরে সেখানকার পরিবেশ কিছুটা ঠাণ্ডা হয়। ছাত্রছাত্রীরা স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে যেতে প্রধানশিক্ষকের সাথে উর্দু এবং সংস্কৃত শিক্ষক বাইরে বের হন। বাইরে বেরিয়েই দেখেন, চারিদিকে ধুন্দুমার কাণ্ড চলছে। স্কুলের চেয়ার টেবিল, আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হচ্ছে। এই ভাঙচুরে শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়, বহিরাগতরাও যোগদান করে। পাঁচ থেকে ছয়জন সিভিক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে নিজেরাই রক্তাক্ত হয়ে অফিসের দিকে ছুটে আসে। আসারুল হক নামে এক শিক্ষক যিনি ম্যানেজিং কমিটির টিচার রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রচণ্ড মার খেয়ে অফিসের সামনে মাঠে লাশ হয়ে পড়ে রয়েছেন। দুজন ছাত্র এবং রক্তাক্ত সিভিক পুলিশরা শিক্ষকের লাশ ভেবে তাঁকে তুলে নিয়ে স্কুলের একটি ঘরে ঢুকে পড়ে। একই ঘরে প্রধানশিক্ষক অভিজিৎ কুণ্ডু, আসিফ ইকবাল নামে জনৈক শিক্ষক, ক্লার্ক, উর্দু এবং সংস্কৃত বিষয়ের শিক্ষকরা আত্মগোপন করেন। ঘরের দরজা এবং জানালাগুলি লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভিতরে গিয়ে সকলে লক্ষ্য করেন, শিক্ষক আসারুল হক অচৈতন্য অবস্থায় থাকলেও বেঁচে রয়েছেন। একটু পরেই ঘরটির বাইরে শ্লোগান শুরু হয় , “এটা হিন্দুস্তান, পাকিস্তান হতে দেবো না।“ “হিন্দুদের স্কুলের উর্দু পড়ানো চলবে না।“ “মুসলমান দূর হটো।“ ইত্যাদি ইত্যাদি…।

এরপর শুরু হয় বাইরে থেকে ঘরের দরজা জানালা ভাঙার প্রচেষ্টা। ইটপাথর এবং শাবল দিয়ে দরজা ভাঙা শুরু হয়। ভিতরের ব্যক্তিরা দরজার সাথে বেঞ্চ লাগিয়ে এবং হাত দিয়ে দরজা আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়। ঘরের বাইরে তখন শুরু হয় বোমাবাজি। প্রত্যেকেই নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা ভাবতে থাকেন, আজই তাঁদের মৃত্যুর দিন। মহিলা সিভিক পুলিশরা প্রথমে থানায় ফোন করে নিজেদের পরিস্থিতির কথা জানান। সেইসাথে নিজের নিজের আত্মীয়স্বজনদের ফোন করে মৃত্যু পূর্ববর্তী ক্ষমা চাইতে শুরু করেন। কাউকে ১৫ সেকেন্ড, কাউকে এক মিনিট ফোন করে বলতে থাকেন, “জীবনে চলাফেরা করতে গিয়ে যদি কোনো অন্যায় করে থাকি তাহলে ক্ষমা করে দিও। আজ আমাদের শেষ দিন।“

এরকম অবস্থায় ঘন্টা দেড়েক কাটানোর পরে র্্যাফ বাহিনী এসে ঘরের ভিতর থাকা অবরুদ্ধ শিক্ষক, ছাত্র, ক্লার্ক এবং সিভিক পুলিশদের উদ্ধার করে। কড়া সিকিউরিটির মধ্যে নিয়ে গিয়ে পুলিশের গাড়িতে চড়ানো হয়। পুলিশের সেই গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়। বোমার আঘাতে গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। গাড়ির ড্রাইভার সজোরে গাড়ি চালিয়ে উপদ্রুত এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যান। গাড়িতে যাওয়ার পথে জনৈক পুলিশ অফিসার অভিমান করে বলেন, “উপরমহলের কাছে আমরা বারবার গুলি চালানো অনুমতি চাইছি। কিন্তু অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। উপরমহল বলছে, ছাত্রছাত্রীদের উপর গুলি চালানো যাবে না। আমরা বলছি, ছাত্রছাত্রী নয়, দুষ্কৃতীরা আমাদের উপর বোমা ছুঁড়ছে। উপরমহল বলছে, দুষ্কৃতীদের সাথে ছাত্রছাত্রীরা রয়েছে। গুলি চালালে ছাত্রছাত্রীদের লাগতে পারে।“ একইসাথে পুলিশ অফিসার অভিমান করে বলেন, “আমরা তো এই চাকুরিতে মরতে এসেছি। আমাদের মার খেয়ে যেতে হবে। এটাই তো ভবিতব্য।“

উপরের পুরো রিপোর্টটি পড়ার পরে মনের ভিতর আর কোনও প্রশ্নই থাকার কথা নয়। এরপরেও কিছু বিষয় বলতেই হয়। সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিকমাধ্যমে ছড়ানো খবর অনুযায়ী, ২০শে সেপ্টেম্বর সংস্কৃত শিক্ষক তোরাংগ মল্লিক এবং উর্দু শিক্ষক মোহাঃ সানাউল্লাহ রাহমানী পুলিশ নিয়ে স্কুলে জয়েন করেননি। ঘটনাক্রমের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেছে, নতুন শিক্ষকরা সাথে করে পুলিশ নিয়ে জয়েন করতে যাননি। বরং জয়েন করার পরবর্তীতে তাঁরা যখন আক্রান্ত, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে তখন পুলিশই এসে তাঁদের উদ্ধার করে। যারা স্কুল চত্বরে পুলিশের প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ না গেলে প্রধানশিক্ষক সহ ঘরের ভিতর আটকে পড়া প্রত্যেকেরই মৃত্যু হতে পারতো।

এখন প্রশ্ন হল, স্কুলে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে ছাত্রছাত্রীদের এরকম বীভৎস রূপধারণ কি স্বাভাবিক? শিক্ষক নিয়োগের ইতিহাসে বাংলায় এরকম ধ্বংসাত্মক কথিত ছাত্র আন্দোলন কি কেউ কখনো দেখেছে? নতুন শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি তো ছাত্রছাত্রীদের জানার কথাই নয়। জানলেও সেনিয়ে মাথা ঘামানোর কথা নয়। কথিত সশস্ত্র ছাত্র আন্দোলন তো অনেক দূরের কথা। অতএব যারা বিষয়টিকে ছাত্র আন্দোলন হিসেবে মনে করেছেন, এই রিপোর্টটি পড়ে আশাকরি তাদের বিভ্রান্তি কাটতে বাধ্য, শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করতে ছাত্ররা এভাবে সশস্ত্র হতে পারে না। তাছাড়া এখানে শুধু ছাত্রছাত্রীরাই ছিল না, মুখে গামছা বাঁধা স্থানীয় দুষ্কৃতীরাও ছিল যারা ব্যাপক বোমাবাজি এবং গোলাগুলি করেছে।

এরপরেও কী বুঝতে অসুবিধা রয়েছে, পুরো ঘটনাটিই পূর্বপরিকল্পিত?

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কারা এই পরিকল্পনার অংশ ছিল? বিজেপি নিজে দাবী করেছে, মৃত দুজন ছাত্রই বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপির কর্মী। ছাত্রছাত্রীদের মুখে যেসমস্ত শ্লোগান ছিল ছিল সেগুলিও মুসলিম বিদ্বেষী। আর মুসলিম বিদ্বেষকে হাতিয়ার করেই বিজেপি এবং সংঘপরিবার হিন্দু-মুসলিম বিভেদ তৈরি করে ভোটবাক্স ভরাট করার খেলা খেলে। অতএব বিষয়টি পর্যালোচনা করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, পুরো পরিকল্পনাটিই করেছে বিজেপি-সংঘ পরিবার।

ম্যানেজিং কমিটিতে যারা থাকেন তাঁদের অনেকেই এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি হন। তাঁরা চেষ্টা করলে কি ছাত্রছাত্রী এবং এলাকার লোকদের বোঝাতে পারতেন না? প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটির একাধিক ব্যক্তি সংঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ এবং মুসলিম বিদ্বেষী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, তাঁরা নিজেরাই ছাত্রছাত্রীদের উস্কানি দিয়েছেন।

স্ত্র ছাত্রছাত্রীদের আক্রমণের ঠিক আগের মুহূর্তেই স্টাফরুম থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে শিক্ষকরা কেটে পড়েছিলেন কেন? তাহলে কী পূর্বপরিকল্পনার কথা তাঁদের আগে থেকে জানানো হয়েছিল?হ্যাঁ, অনেক শিক্ষকই পরিকল্পনাটি জানতেন। কেউ কেউ জড়িত ছিলেন কিনা সেটা অবশ্য তদন্তসাপেক্ষ।

যারা বাংলাপ্রেমী হয়ে, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে অনর্থক উর্দু বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন এবং বলছেন, সার্ভিস কমিশন বাংলা শিক্ষক না দিয়ে উর্দু শিক্ষক দিয়ে মুসলিম তোষণ করছে, তাদের জ্ঞাতার্থে একটি পরিসংখ্যান রইল,
সার্ভিস কমিশন দ্বারা সুপারিশ করা পিজিতে(এইচ এস সেকশন) আসন সংখ্যাঃ
বাংলা-১৬৪টি
সংস্কৃত-২৯৫ টি
উর্দু-১২টি
আরবি- ১২টি

পরিশেষে সকল রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন, নেটিজেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন, সাম্প্রদায়িক শক্তির তৈরি পরিকল্পনা থেকে সাবধান থাকুন। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে বিজেপি-আর এস এস এর মতো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং-এর জন্য যাঁরা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন তাঁদের প্রতি রইল অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। Manisha Dasgupta এবং Muhammed Mahdi Hasan এঁর প্রতি আলাদাভাবে ভালোবাসা রইল।

ধন্যবাদান্তে- মুহাম্মদ জিম নওয়াজ

Show More

Related Articles

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker
WhatsApp us