দেশপ্রথম পাতাব্রেকিং নিউস

সারা দেশের মধ্যে শুধু কলকাতায় পুবের কলমের উদ্যোগে পালিত হল মণিপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজের পতাকা উত্তোলন বার্ষিকী

 

গোলাম রাশিদ


সময়টা ভুলে যাওয়ার, ইতিহাস বিকৃত হওয়ার। তাই দেশের মূল ভূখণ্ডে প্রথম যেদিন তেরঙ্গা উত্তোলন করা হয়েছিল, তার উদযাপন নেই দেশজুড়ে কোথাও। ব্যতিক্রম দেশের সাংস্কূতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসের সভাকক্ষ। এখানেই দৈনিক পুবের কলম ও সাংস্কূতিক সংস্থা ‘একটি কুসুম’-এর উদ্যোগে পালিত হল মণিপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজের পতাকা উত্তোলনের ৭৫তম বর্ষের শুভদিনটি। ১৯৪৪ সালের এই ১৪ এপ্রিলেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ কর্নেল শওকাত আলি মালিকের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের পরাজিত করে মণিপুরের মৈরাং-এ পতাকা উত্তোলন করে। পুবের কলমের আয়োজনে জীবন্ত হয়ে উঠল সেই দিনটির ইতিহাস। উপস্থিত বিদগ্ধ বক্তাদের বক্তব্যে ফুটে উঠল আজাদ হিন্দ ফৌজ ও নেতাজির সংগ্রামের কথিত-অকথিত নানা কাহিনি।

এদিনের সভায় উপস্থিত ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. সুরঞ্জন দাস– আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহাম্মদ আলি ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. আমজাদ হোসেন– গবেষক জাহিরুল হাসান– অধ্যাপক কাজি সফিউর রহমান ও পুবের কলমের সম্পাদক– সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান।

প্রারম্ভিক বক্তব্য দিতে গিয়ে আহমদ হাসান ইমরান জানান, ১৪ এপ্রিল তারিখটি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। আমরা আজ একটি ঐতিহাসিক দিনকে উদযাপন  করতে চলেছি। আজাদ হিন্দ ফৌজ বার্মা হয়ে মণিপুরে প্রবেশ করে এর একটি এলাকা দখল করে। আর এরপর ১৯৪৪-এর আজকের দিনে কর্নেল শওকাত আলি মালিকের নেতৃত্বে প্রথম তেরঙ্গা উত্তোলিত হয়। তরুণ প্রজন্মের বেশিরভাগই এই বিষয়টি সম্পর্কে জানে না। আমরা যদি এইসব অকথিত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে না ধরি, তবে সেটা বিশাল অপরাধ বলে গণ্য হবে। বর্তমান সময়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে ইমরান বলেন, নেতাজির সংগ্রাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অনুকরণীয়। তাঁর ফৌজে মুসলিম– হিন্দু– শিখরা যেভাবে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল, চলমান সময়ের বিভাজনের রাজনীতিকে পরাস্ত করতে সেই সংগ্রাম আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।

তিনি অভিযোগ করেন, মৈরাং-এর এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে একটি মিউজিয়াম ও স্মৃতিফলক লাগানো হলেও কর্নেল শওকাত আলি মালিকের কোনও স্মৃতিচিহ্ন নেই। এটি বড়ই আফসোসের বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ড. সুরঞ্জন দাস বলেন, স্বাধীন ভারতের জাতি গঠনের ইতিহাসে এপ্রিল মাসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসের ১৩ তারিখে ঘটেছে জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস ঘটনা , ১৪ তারিখে বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মদিন ও মৈরাং-এ শওকাত আলি মালিকের এই বিজয় দিবস। তিনি তাঁর বক্তব্যে ভারত ছেড়ে নেতাজির ‘নিষ্ক্রমণ’ থেকে শুরু করে একদম স্বাধীনতা পর্যন্ত আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম ও প্রভাবের কাহিনি বর্ণনা করেন।

সাম্প্রতিক সময়ের উগ্র জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদের সমালোচনা করে তিনি নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজের সাম্প্রদায়িক সদ্ভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই সংগ্রাম থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। নেতাজির ছায়াতলে কীভাবে সব ধর্মের মানুষ এক হয়ে স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার উল্লেখ করে জানান, আজাদ হিন্দ ফৌজের আক্রমণ ও পরবর্তীতে তাদের সেনাদের মুক্তির দাবিতে সারা দেশজুড়ে রাজনৈতিক উন্মাদনা ইংরেজদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৪৬-এ নৌবিদ্রোহ হয়। আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রসিদ খানের কারাদণ্ড হলে বিক্ষোভে েফটে পড়ে দেশ। দিল্লি– বোম্বাই– কলকাতা–কটক– মিরাটে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। ফৌজের বন্দি সেনাদের মুক্তির দাবিতে জওহরলাল নেহরু– তেজবাহাদুর সপ্রু– ভুলাভাই দেশাইরা আদালতে আইনি লড়াই শুরু করেন। দেশজুড়ে এই স্বতঃস্ফূর্ত ব্রিটিশ-বিরোধিতার ফলস্বর*প পরবর্তীতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে বাধ্য হয় ইংরেজ শাসকরা। তবে পরিশেষে সুরঞ্জন দাস তাঁর বক্তব্যে দেশভাগ ও খণ্ড ক্ষমতার হস্তান্তরকে বর্তমানের বহু সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন– এই ভারতবর্ষ নেতাজি দেখতে চাননি। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়নি। আজ যদি আমরা অঙ্গীকার করতে পারি– তাঁর দেখানো পথে ভারতকে গড়ে তুলব– তবেই তাঁর সংগ্রাম সফল হবে– শওকাতদের সংগ্রাম সফল হবে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজি সফিউর রহমান তাঁর বক্তব্যে নেতাজির ধর্ম-নিরপেক্ষতা– বহুত্ববাদী আদর্শ– আঞ্চলিকতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণের পরিচয় তুলে ধরেন। ১৯৪০ সালে ৩ জুলাইকে সিরাজ স্মৃতি দিবস হিসেবে পালন করার যে ডাক সুভাষ দিয়েছিলেন তার ইতিহাস বিবৃত করে তিনি নেতাজির ধর্মনিরপেক্ষতার স্বর*পটি েশ্রাতাদের সামনে তুলে ধরেন।
এদিনের সভায় অতিথি-শ্রোতা হিসেবেও বহু বিদ্বজন হাজির হয়েছিলেন দুপুরের গরম ও রোদ উপেক্ষা করেই। অধ্যাপক সাইফুল্লা, সাফুরা রাজেক, আবদুল মুজিদ, মুহাম্মদ কামরুজ্জামান, অরুণজ্যোতি ভিক্ষু, বুদ্ধপ্রিয় ভান্তে, সাংবাদিক গোলাম গাউস সিদ্দিকি প্রমুখ আলিয়ার সভাকক্ষে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনাসভার শুরুতেই জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে (১৩ এপ্রিল, ২০১৯-এ সেই ঘটনার শতবর্ষ) উপস্থিত সবাই এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গাজালা ইয়াসমিন।

Show More

Related Articles

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker
WhatsApp us