দেশব্রেকিং নিউসসম্পাদকীয়

অসমে গরুর মাংস বিক্রয়কারী অভিযোগে বৃদ্ধ শওকত আলিকে প্রহার, কেন এই অসহিষ্ণুতা?

জোর করে ভক্ষণ করানো হয় শূকরের মাংস

আবার কথিত গো-মাংস। আবারও নৃশংস হামলা একজন ধর্মভীরু ও মেহনতি মুসলিমের উপর। সেই পুরনো অভিযোগ– তিনি গো-মাংস বিক্রি করছিলেন। এবারের ঘটনাস্থল অসমের বিশ্বনাথ চারিআলি। উল্লেখ্য– এই বিশ্বনাথ চালিআলি জেলা তেজপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। ৬৮ বছর বয়সি শওকাত আলিকে গরুর গোশ্ত বিক্রয়ের অভিযোগে যেভাবে রক্তাক্ত করা হয়– তাতে তাঁর মৃতু্য হওয়ারই কথা। কিন্তু এূনও তিনি বেঁচে রয়েছেন আর বিশ্বনাথ সিভিল হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে। ৩ দিন আগে ঘটনাটি সামনে আসে যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় শওকাত আলির উপর প্রাণঘাতী পাশবিক হামলার ভিডিয়োটি প্রচারিত হয়। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে– হামলাকারী যুবকরা ছিল প্রবলভাবে সাম্প্রদায়িক। নির্যাতন শুরু করার আগে যূন তিনি নামায আদায় করছিলেন– সেই সময় হামলাকারীরা শওকাত আলিকে নামায পড়তে বাধা দেয়। শওকাতের বিরুদ্ধে গো-মাংস বিক্রয় ও তাঁর ভাত-হোটেলে গোশ্ত পরিবেশনের অভিযোগ তোলে। গেরুয়া হামলাকারীরা এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা বিশ্বনাথ বাজার থেকেই শূকরের মাংস কিনে এনে এই নিরীহ মানুষটিকে খেতে বাধ্য করে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না– সারাবিশ্বের মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায় শূকরের মাংসকে হারাম (নিষিদ্ধ) ও অপবিত্র গণ্য করে। এ সম্পর্কে বৃদ্ধ শওকাত আলি হাসপাতালের বেডে শুয়ে সাংবাদিকদের বলেন– আমাকে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করা হয়। আমার পাঞ্জাবি রক্তে লাল হয়ে যায়। আমাকে জবরদস্তি শূকরের কাঁচা মাংস খাওয়ানো হয়। অথচ আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা বিশ্বনাথ চারিআলি বাজারে ৪৫ বছর ধরে এই ভাতের হোটেল চালাচ্ছি। মুসলিম– খ্রিস্টান ও আদিবাসী-উপজাতিরা আমার দোকানে নিয়মিত গ্রাহক ছিল। কখনোই আমাকে এই ধরনের পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী একজন মুসলিম স্কুলশিক্ষক বলেন– হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল শওকাত আলিকে নির্যাতন করে প্রাণে মেরে ফেলা– নইলে তাঁর জাত-ধর্ম-ঈমান নষ্ট করে ফেলা। তাই তাঁকে তারা প্রচণ্ড মারপিট করে এবং গলা টিপে শূকরের মাংস গিলতে বাধ্য করে। তবে এভাবে মুসলিমদের ধর্ম বা ঈমান যায় না। কেউ জবরদস্তি শূকরের মাংস বা নিষিদ্ধ বস্তু খাওয়ালেই মুসলমানদের ঈমান যায় না। তিনি আরও বলেন– শওকাত সাহেব যে বেঁচে গেলেন তা আল্লাহর রহমত।
শওকাতের দোকানটিকে যে নিশানা করা হয়েছে– তার ইঙ্গিত আগেই পাওয়া গিয়েছিল। জখম শওকাত সাংবাদিকদের বলেন– বৃহস্পতিবার সকালের দিকে দু-তিনজন ছেলে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে– আমার এই ভাতের হোটেলে গরুর মাংস বিক্রি হয় করা কিনা। আমরা ৪৫ বছর ধরে মোষ– গরু ও খাসির মাংস পরিবেশন করে থাকি। কাজেই আমি বলে থাকি– হ্যাঁ। এলাকার মহালদার এসে আমাকে গরু-মোষের মাংস বিক্রি করতে নিষেধ করে এবং বলে– হোটেল চালাতে কোনও বাঁধা নেই। এরপর রোববার বিকেল ৩টে নাগাদ ২০-২৫ জন যুবক আমার হোটেলে প্রবেশ করে এবং ভাঙচুর শুরু করে। তারা গ্যাস-সিলিন্ডারটিও নিয়ে যায়। পুলিশ অফিসার এসেও আমার উপর অমানবিক প্রহার বন্ধ করতে পারেনি। আমি জীবন-ভিক্ষা চাইলেও তারা লাঠিপেটা ও মারধর থামায়নি। শওকাত আলিকে প্রশ্ন করা হয়– তিনি কি বাংলাদেশি? তাঁর নাম কি এবার নাগরিকপঞ্জিতে উঠেছে। তাঁর কাছে কি গো-মাংস বিক্রয়ের লাইসেন্স রয়েছে? হামলাকারীরা এমনই সব সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন করে শওকাত আলিকে।
উল্লে্খ্য– ঘটনার কয়েকদিন পরেই ১১ এপ্রিল কিন্তু তেজপুর কেন্দ্রে ভোট হবে। ভোটকে প্রভাবিত করার জন্য একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। বিশ্বনাথ জেলার পুলিশ সুপার রাকেশ রৌশন এবং ডিসি পবিত্ররাম খাউন্দ বলে– শওকাতের পরিবার থেকে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। এই হামলার অভিযোগে মাত্র দু’জনকে পুলিশ আটক করেছে। এই হামলাকারীর দল বাজারের কন্ট্রাক্টর কমল থাপাকেও মারধর করে।
শওকাতের ভাই শাহাবুদ্দিন বলেন– এই দ্বি-সাপ্তাহিক হাটে আমাদের দোকানে এসে বৃহস্পতিবার কয়েকজন যুবক খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলে আমরা রোববারের হাটে আমাদের হোটেলে গরুর গোশ্ত রাূিনি। তা সত্ত্বেও এই হামলা চালানো হয়।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য– অসমে গরুর মাংস কূনোই নিষিদ্ধ করা হয়নি। পশ্চিমবাংলার মতোই অসমে জারি রয়েছে ‘অসম গবাদি পশু সংরক্ষণ আইন ১৯৫০’। এই আইন অনুযায়ী– ১৪ বছরের বেশি বয়স্ক গবাদি পশুকে ভেটেনারি চিকিৎসকের সার্টিফিকেট নিয়ে জবাই করার অনুমতি রয়েছে। অসমে শুধু মুসলিমরা নয়– খ্রিস্টান এবং অন্যান্য জাতিরাও গরুর মাংস খান। কিন্তু শুধুমাত্র মুসলমানদেরই এ বিষয়ে টার্গেট করা হচ্ছে। এর আগে গতবছরের আগস্ট মাসে এই বিশ্বনাথ জেলাতেই গরুচোর সন্দেহে একজন সংখ্যালঘুকে হত্যা ও ৩ জনকে গুরুতর আহত করা হয়েছিল।
ভাগ্যক্রমে শওকাত আলি বেঁচে গেলেও প্রশ্ন উঠেছে— গরু পাচারকারী কিংবা গরু হত্যাকারী বলে যেভাবে ভারতে ‘লিঞ্চিং’ চলছে এবং এই ধরনের হত্যা ও নির্দয় প্রহারের জন্য কেউই শাস্তি পাচ্ছে না—তার শেষ কোথায়? একজন অমুসলিমকে জোর করে গো-মাংস খাওয়ানোর চেষ্টা হচ্ছে—এই রকমের কোনও ঘটনা আফগানিস্তান– পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে ঘটলে তা আমাদের দেশসহ সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সক্রিয় করে তুলত। সঠিক ও স্বাভাবিকভাবেই নিন্দা এবং প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যেত। ভারতে ২০১৪ সালে বিজেপি রাজত্ব শুরু হওয়ার পর গরু নিয়ে ১২২টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে জানা গেছে– যাঁরা নিহত হয়েছেন– তাঁদের ৯৭ শতাংশ হচ্ছেন মুসলিম।

Show More

Related Articles

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker
WhatsApp us