গোলাম রাশিদ: হাতে স্মার্টফোন, ব্যস্ত জীবন। তবু বইয়ের টানে নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে বাংলাদেশ বইমেলাতে ঠিক হাজির বাংলার বইপ্রেমীরা আর তাদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী– টেকস্যাভি জেনারেশন ওয়াই। স্কুল-কলেজ ছুটি। তাই বিকেলের বৈঠক–আড্ডা জমছে মোহরকুঞ্জের বাংলাদেশ বইমেলা প্রাঙ্গণেই। সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া দীপাঞ্জন– সাবিররা জানাচ্ছে– ছুটির বিকেলটা তো আড্ডা-সিনেমাতেই কাটে। সেই আড্ডাটা বইমেলাতে হলে বেশ ভালোই লাগে। অনেক দরকারি বইও পেয়ে যাই।

‘সায়েন্স ও টেকনোলজি নিয়ে বেশকিছু বাংলা বই কিনেছিও’– বলল বইমেলায় ঘুরতে আসা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পড়ুয়া। দুটো থেকে শুরু করে আটটা পর্যন্ত খোলা থাকছে বইমেলার স্টলগুলি। অফিস ফেরত অনেকে তাই বিকেল হলেই ঢুঁ মারছেন রবীন্দ্র সদনের উলটো দিকে মোহরকুঞ্জের বইমেলাতে৬৯টি প্রকাশনার কয়েক লক্ষ নতুন-পুরোনো বই নেড়েচেড়ে দেখছেন তাঁরা– প্রয়োজন হলে কিনছেন। না-কেনার অজুহাত হিসেবে সময়ের অভাবের পাশাপাশি অনেকেই আঙুল তুলছেন ই-বুকের দিকে। বেশকিছু বইপ্রেমীকে দেখা গেল— ভিড় জমিয়েছেন ‘অন্যপ্রকাশ’-এর স্টলের সামনে। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের বেশিরভাগ বই তাদেরই প্রকাশনার। সবই অনলাইনে– পিডিএফে পড়া সারা। বন্ধুকে উপহার দেওয়ার জন্য অবশ্য হুমায়ুনের বই কিনছেন অনেকে। তবে হুমায়ুন-রাজত্বের পাশাপাশি লোকসংস্কূতি চর্চার গবেষণামূলক বই– বিদেশি নোবেলজয়ী লেখকদের বইয়ের বাংলা তরজমা দেদার বিক্রি হচ্ছে বলে জানালেন মাওলা ব্রাদার্সের বই বিক্রেতা জহিরুল কবির। মাওলা ব্রাদার্সেই পাওয়া যাচ্ছে জয়া চ্যাটার্জির ‘দ্য স্পয়েলস অব পার্টিশন’-এর বাংলা তরজমা ‘দেশভাগের অর্জন’। দেশভাগের ট্রাজেডি ও তাঁর ফলাফল নিয়ে বইটিতে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ এই বইমেলা। বঙ্গবন্ধুর জীবনী– তাঁকে নিয়ে নানা ব্যক্তির স্মৃতিচারণামূলক বইয়ের উল্লেখযোগ্য সমাহার বাংলাদেশ বইমেলাতে। তবে তসলিমা নাসরিনের বইয়ের যে ব্যাপক সম্ভার আগের বাংলাদেশ বইমেলা ও কলকাতা বইমেলাগুলিতে দেখা গিয়েছে– এ বারের বইমেলাতে তার ছিটেফোঁটাও নেই। হঠাৎ করে তসলিমার বইয়ের এমন কমতি কেন? বিক্রেতাদের জিজ্ঞেস করতেই তাঁরা হেসে বললেন– তসলিমার লেখা নতুন কোনও বই নেই ইদানীংকালে। তাই মানুষের আগ্রহও নেই। আমাদের কাছে তাঁদের বইই রাখি যাঁদের কাটতি আছে। মেরিট ফেয়ার প্রকাশনের স্টলে ইতিহাসবিষয়ক বইয়ের ভালোই সংগ্রহ দেখা গেল। মাহবুবুর রহমানের ‘ভারতের মুসলমানদের ইতিহাস’– ‘মুসলিম প্রত্নতত্ত্ব ও স্থাপত্য এবং মুসলিম চিত্র ও শিল্পকলা’ পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। নওরোজ সাহিত্য সম্ভারের স্টলে আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’– ‘কাবিলের বোন’– ‘উপমহাদেশ’– আবু ইসাহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’র চাহিদা ভালোই। প্রথমা প্রকাশনীর স্টলে বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ের সমাবেশ ঘটেছে। ইবনে ইসাহাকের ‘সিরাতে রাসূলুল্লাহ (সা.): মহানবীর প্রথম বিশদ জীবনী’টি পাওয়া যাচ্ছে বাংলা তরজমায়। রেজা খানের ‘পাখিবিশারদ সালিম আলি’ সব ধরনের পাঠককেই আকর্ষণ করছে। ইসলামি স্বর্ণযুগের ইতিহাস– সমাজবিদ্যা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে লেখা ইবনে খালদুনের ‘ আল মুকাদ্দিমা’ মাস্টারপিসটি এখন পড়তে পারেন মাতৃভাষা বাংলাতেই। ইসলামি সভ্যতা– কৃষ্টি-কালচার নিয়ে বহু বইয়ের সমাবেশ ঘটেছে এই অষ্টম বাংলাদেশ বইমেলায়। তবে বিগত বছরের বইমেলাগুলিতে হিন্দু-মুসলিম পাঠকরা ভিড় জমাতেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের স্টলে। তাদের প্রকাশনার বইয়ের জন্য সবার আলাদা একটা আগ্রহ দেখা যেত। এ হেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কোনও স্টল না থাকায় কার্যত হতাশ দূর-দূরান্ত থেকে আসা আগ্রহী ক্রেতারা। বিক্রেতারা জানাচ্ছেন– অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বইয়ের বিক্রি বেশি। ১১ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে বইমেলা। শেষমুহূর্তে বিক্রি আরও বাড়বে – আশা করছেন বিক্রেতারা। গতবছর বাংলাদেশ বইমেলার সময় কলকাতাতে বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে ব্যবসা জমেনি। এ বছরের ঝকঝকে আবহাওয়া মোহরকুঞ্জের বইমেলা প্রাঙ্গণে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছে বইপ্রেমীদের। এর পাশাপাশি বিকেল থেকেই রোজ শুরু হয়ে যাচ্ছে কবিতাপাঠ– গান, হচ্ছে নতুন বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানও। স্বভাবতই পাঠক-লেখকের সমাবেশ ঘটছে– যা এক বাড়তি প্রাপ্তি সকলের জন্য।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of