শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের উপত্যকায় সাদা চামড়ার নীল নয়নের অধিকারী একটি ক্ষুদ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠি বসবাস করে আসছে যারা ‘কালাসা’ নামে পরিচিত। এই জনগোষ্ঠীটি বহু শতাব্দী ধরে বন্য প্রাণীদের পোষ মানিয়ে আসছে।

কিংবদন্তী অনুসারে কালাসা জনগোষ্ঠীদের ইতিহাস মহান আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনীর সাথে জড়িত, যার সৈন্যরা যিশু খ্রিষ্টের জন্মের পূর্বকার ৩ শতাব্দীতে পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলে এসে পৌঁছিয়েছিল।

কালাসা জনগণ যারা একেবারে ভিন্ন একটি ভাষায় কথা বলে এবং তাদের কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ বা ধর্মীয় উপাসনালয় নেই। তবে তারা বসন্তের শেষে নিজস্ব কিছু রীতিনীতি পালন করে থাকেন। তাদের এসব উৎসবে বিভিন্ন রং বেরঙের কস্টিউম থাকে এবং প্রাচীন নাচ গান হয়ে থাকে।

 বছরগুলোতে কালাসা জনগোষ্ঠীর লোকজনের মধ্যে সুন্নি ইসলাম ব্যাপক প্রভাব রাখতে শুরু করেছে এবং নাটকীয়ভাবেই এই আদিবাসীদের মধ্যে এখন অমুসলিম জনসংখ্যা একেবারেই কমে গেছে।

স্থানীয় একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত তিন বছরে অন্তত ৩০০ কালাসা জনগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। ৪,১০০ কালাসা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখন ৩,৮০০ লোকজন রয়েছেন যারা এখনো ধর্মান্তরিত হননি।

কালাসা জনগোষ্ঠীর অনেক তরুণী নারী মুসলিমদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন এবং তারা ইসলামের সংস্পর্শে এসে মুসলিম হয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে কালাসা জনগোষ্ঠীর উপত্যকায় অন্তত ১৮টি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।

‘কালাসা জনগোষ্ঠীর যেসব লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন তারা তা স্বেচ্ছায় করছেন। কিন্তু আমাদের জনগোষ্ঠীকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা দরকার।’ জানাচ্ছেন ওয়াজিরজাদা খান নামের একজন কালাসা রাজনীতিবিদ।

৩৪ বছর বয়সী আকরাম হুসাইন বলেন, ‘তিনি তার পরিবারে জীবিত শেষ কোনো কালাসা মানুষ। তার মায়ের মৃত্যুর পরে তার পিতা একজন মুসলিম নারীকে বিবাহ করেছেন।’

ফিরোজ নামের একজন কালাসা শিক্ষক বলেন, এখানকার বিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি ইসলামিক শিক্ষা দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘যদি আপনি শুরু থেকে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি ইসলামিক বিষয় সমূহ অধ্যয়ন করেন তবে স্বাভাবিকভাবেই আপনি ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত হবেন।’

সম্প্রতি কয়েক বছর যাবত কালাসা জনগোষ্ঠী ইউরোপীয় দেশসমূহ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে সমর্থন পেয়ে আসছেন। তারা সেখানে স্থানীয় কালাসা ভাষা শিক্ষা দিতে ব্যাপক সহায়তা করছেন।

লালি গুল নামের ছয় সন্তানের জননী বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদেরকে বিবাহ নিয়ে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করি না। যখন একজন কালাসা মেয়ে একজন মুসলিমকে বিবাহ করতে চায় তখন আমরা বাধা দিই না এবং সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম পরিবারটির সাথে বসবাস করার জন্য চলে যায়।’

কালাসা উপত্যকার ইমাম জমরোজ খান যার দাদা ৭০ বছর পূর্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তিনি বলেন, কালাসা প্রথাসমূহ অনেকটা ইসলাম বিরোধীদের প্রথার মতোই। তবে তিনি জোর দিয়ে দাবি করে বলেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য কাউকে জোর করা হয় না।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ধর্ম প্রচার করতে চাই এবং তাদেরকে সঠিক পথের দিকে আসার জন্য আহ্বান জানাই।’

জমরোজ খান গর্ব করে বলেন, ‘কয়েক দশক পূর্বেও এখানে কোনো মুসলিম পরিবার ছিল না, কিন্তু এখন এ গ্রামের অর্ধেকের বেশি গ্রামবাসী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।’

লালি গুল বলেন, একদিন এখানে একজন মুসলিম পর্যটক এসেছিলেন এবং তিনি তার মেয়ের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। উভয়ে পরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় কিন্তু তিনি তার মেয়েকে বাধা প্রদান করেননি।

তিনি বলেন, ‘আমরা একেবারেই মুক্ত এবং খোলা মনের মানুষ। আমাদের সন্তানরা কালাসা হিসেবে থাকবে নাকি মুসলিম হয়ে যাবে তাতে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করি না।’

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of