সম্প্রতি একটি বিষয় নিয়ে বেশ বিতর্ক হচ্ছে। তা হল– মুসলিমদের ইবাদাত ও নামায পড়ার জন্য মসজিদ কি অপরিহার্য? এ সম্পর্কে আদালতের রায় হচ্ছে– নামাযের জন্য মসজিদ অপরিহার্য নয়। আসলে বাবরি মসজিদ প্রসঙ্গেই এই রায়টি এসেছে। রায়টি দিয়েছিল ১৯৯৪ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টও এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে।
তবে শীর্ষ আদালতের তিন সদস্যের বেঞ্চের অন্যতম বিচারপতি এস আব্দুল নাজির ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন– মসজিদ ইসলামের অপরিহার্য অঙ্গ কি-না– তা অবশ্যই নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ সারা বিশ্বে মুসলিম ও অমুসলিম-প্রধান দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ রয়েছে। মসজিদ কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী ধর্মীয় বিশ্বাসের অঙ্গ। কাজেই এ সম্বন্ধে আরও গভীরভাবে এবং বৃহত্তর বেঞ্চে পর্যালোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু সংখ্যাধিক্য বিচারপতিরা বিষয়টিকে ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি।

নিবন্ধকার অধ্যাপক মুহাম্মদ মেহেদি হাসান মসজিদ সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

‘মসজিদ’ একটি আরবি শব্দ। ব্যাকরণগত দিক দিয়ে শব্দটি ‘ইসমে মাকান’। ক্রিয়ামূল ‘সাজাদা’র (অর্থ সিজদাহ্ করা)– পূর্বে মিম (ম) প্রত্যয় যুক্ত হয়ে মসজিদ শ·টি তৈরি হয়েছে। যেমন ক্রিয়া জালসা’র (বসা) পূর্বে মিম যুক্ত হয়ে মজলিস (বসার স্থান) হয়েছে বা ‘নাযালা’ (অবতরণ করা) থেকে মনযিল (অবতরণের স্থল) হয়েছে। মসজিদ শ·টির আভিধানিক অর্থ হল ‘সিজদাহ্ করার স্থল’– ‘ইবাদাতগাহ্’– উপাসনালয় ইত্যাদি।
আমরা সকলেই অবগত যে– সিজদাহ্ করা হয় নামাযে। সেদিক দিয়ে মসজিদের অর্থ হল নামাযের স্থল বা জায়গা। আর হাদিস অনুযায়ী নামায হল ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এখন নামায যদি অত্যাবশ্যক হয়– তাহলে নামাযের জন্য নির্ধারিত স্থানটিও হবে অত্যাবশ্যক। এদিকে মসজিদ নির্মিতই হয় সিজদাহ্র স্থল হিসাবে। আর নামায-প্রক্রিয়ার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সিজদাহ্। বিশ্বনবী সা. বলেন,   ‘সিজদাহ্র সময় বান্দাহ্ সবচাইতে তার রবের নিকটবর্তী হয়।’ সুতরাং– ‘সাজাদা’ ধাতু থেকে উদ্ভূত মসজিদের অত্যাবশ্যকতা খুব সহজেই অনুমেয়।

মসজিদের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে মহান আল্লাহ্ বলেন ঃ ‘নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহ্রই জন্য। সুতরাং– তোমরা আল্লাহ্র সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।’ স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে– মসজিদের মূল উদ্দেশ্য স্টËষ্টার সমীপে উপস্থিত হয়ে তাঁকে আহ্বান করা। এখানে আয়াতে ‘দুয়া’ শ·টি ব্যবহ*ত হয়েছে। নামাযও (সালাত) আরবিতে দোয়া অর্থে ব্যবহ*ত হয়। সুতরাং কুরআনই স্পষ্ট করেছে যে– নামায হবে মসজিদেই। এই মহান ঐশী বাণীর অন্যত্র বলা হয়েছে– ‘আল্লাহ মসজিদ আবাদকারী তো তারাই যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্র প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং যারা নামায কায়েম করে ও যাকাক প্রদান করে।’ (সূরা তাওবাহ্– আয়াত ঃ ১৮) মসজিদের গুরুত্ব– সম্মান– পবিত্রতা ইত্যাদি বোঝাতে এটিকে ‘বায়তুল্লাহ্’ বা ‘আল্লাহ্র ঘর’ বলা হয়েছে। মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন ঃ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনে কোনও মসজিদ নির্মাণ করে আল্লাহ্ তাঁর জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।’ (বুখারি)

রাসূলুল্লাহ্ সা. ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পথে শহরের উপকণ্ঠ কুবা’য় মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর তিনি মদিনায় প্রবেশ করে সর্বপ্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আঞ্জাম দিয়েছিলেন তা হল– ‘মসজিদে নববি’র নির্মাণ। মসজিদে নববি ছিল নব্য প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সমাজব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র স্বরুপ। এর গুরুত্ব কেবল নামায আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তদানীন্তনকালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা না থাকায় এটিই ছিল মুসলিম সমাজের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র। এর ‘ক্যাম্পাস’-এ বসেই সাহাবীগণ ইসলামের যাবতীয় শিক্ষা-দীক্ষা ও হিদায়াতের পাঠ গ্রহণ করতেন। বিদ্যালয়ের পাশাপাশি এটি ছিল এক অনন্য মিলনকেন্দ্র। বিভিন্ন দেশ ও এলাকা থেকে আগত দূত– প্রতিনিধি ও মেহমানদেরকে রসূল সা. মসজিদেই স্বাগত ও অভ্যর্থনা জানাতেন। এখানে বসেই প্রাক-ইসলামি অন্ধকার যুগের দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ঝগড়া-বিবাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহের অবসান ঘটিয়ে বিভিন্ন গোত্র ও কবিলার মধ্যে শান্তি– সম্প্রীতি– সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের দৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলা হয়েছিল।
এই মসজিদই ছিল তদানীন্তনকালের সংসদ তথা রাষ্টÉপতি ভবন। রাষ্টÉ পরিচালনা– প্রতিরক্ষা– বিদেশনীতি– সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন সহ সমস্ত কর্মই সেখান থেকে পরিচালিত হত। এককথায়– জনগণের সামাজিক– রাজনৈতিক– অর্থনৈতিক– ধর্মীয় সহ সমস্ত বিষয়ের দিকনির্দেশনা মসজিদ থেকেই প্রদত্ত হত। এমনকী বিচারালয়– বন্দিখানা এবং কিছু সাহাবীর আবাসস্থল র*পেও ব্যবহ*ত হয়েছে মসজিদ।

তবে মসজিদের মূল ও মুখ্য উদ্দেশ্য হল নামায আদায় করা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে ঃ ‘জামায়াতে নামায পড়লে তার সওয়াব সাতাশ গুণ পর্যন্ত অধিক হয়।’ (বুখারি) পৃথিবীর প্রথম মসজিদ কাবা শরীফে এক রাকায়াত নামাযের সওয়াব লক্ষ রাকায়াতের সমান। এছাড়া মসজিদে নববিতে এক রাকায়াতের বিনিময়ে এক হাজার রাকায়াতের সওয়াব পাওয়া যায়। তবে মসজিদে শুধু নামায পড়া নয়– মসজিদ গমনকারী ব্যক্তি প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময় সওয়াব– মর্যাদা এবং ক্ষমা লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন ঃ ‘যে ব্যক্তি তার বাড়িতে পবিত্রতা অর্জন করল অতঃপর ফরয ইবাদাত আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদ যাত্রা করল– তার এক পদক্ষেপের বিনিময়ে গুনাহ মার্জনা হয় এবং অপর পদক্ষেপের বিনিময়ে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়’ (মুসলিম)। অন্যত্র বলা হয়েছে ঃ ‘মসজিদে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য ফেরেশতাগণ দোয়া করতে থাকেন।’

মসজিদ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাম্য-কেন্দ্র। আযানের ধ্বনি শুনে ধনী-গরিব– মালিক-চাকর– সাদা-কালো– |র্ধ্বতন–-অধস্তন– নেতা-কর্মী– ছোট-বড় সকলে মসজিদে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে নামায আদায় করে। এই নামাযে একজন ফকিরও বাদশাহ্র ইমাম বা নেতা হতে পারে। এখানে উপস্থিত হয়ে এই বোধ ও উপলব্ধি সুদৃঢ় হয় যে স্টËষ্টার নিকট সকল মানুষ সমান।

মসজিদ ছাড়া মুসলিম সমাজ কল্পনাই করা যায় না। হাদিস অনুযায়ী– আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় স্থান হল মসজিদ। কম্পাসের কাঁটার অভিমুখ যেমন সর্বদাই উত্তরমুখী থাকে– তেমনি খাঁটি মুসলিমের হ*দয়ও সর্বদা মসজিদমুখী হয়। মসজিদপ্রেমীদের জন্য সুসংবাদ প্রদান করে রাসূলুল্লাহ্ বলেন ঃ ‘কিয়ামতের ছায়াহীন দিবসে সাত প্রকার লোককে আল্লাহ্ স্বীয় আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। তার মধ্যে ওই লোকেরা অন্তর্ভুক্ত যাঁদের হ*দয়-মন সর্বদা মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে’ (বুখারি)।

মসজিদের সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। প্রত্যহ পাঁচবার নামায পড়তে এসে মহল্লার লোকেরা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়। কাতারে পাশাপাশি দাঁড়ায়। ফলে মনের মলিনতা দূরীভূত হয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। একে অপরের সুখ-দুঃখ– ভালো-মন্দের বিষয়ে অবগত হয়। জুমআ মসজিদগুলিতে মুসলিমরা খুৎবার মাধ্যমে দ্বীন-দুনিয়ার সাপ্তাহিক জ্ঞান লাভ করে।

ইসলাম একটি বিশ্বজনীন জীবনব্যবস্থা। মানুষের সাধ্যের অতীত কোনও বিধি ইসলামে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। ধর্ম পালনে কোনও অবাস্তব কঠোরতাও আরোপ করা হয়নি। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এতে রয়েছে এক সুন্দর নমনীয়তা ও বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ। যেমন জল দিয়ে ওষু করার নিয়ম হলেও জলহীন অবস্থায় মাটি দিয়েও তায়াম্মুম করার বিধান আছে। অনুর*পে মসজিদে ফরয নামাযের বিধান থাকলেও যে-কোনও পবিত্র স্থানে প্রয়োজনে নামায পড়া যেতে পারে। মনে করুন– আপনি এমন জায়গায় আছেন যেখানে কোনও মসজিদ নেই কিন্তু নামাযের সময় উপস্থিত। সেক্ষেত্রে আপনি মাঠে-ঘাট– রাস্তা– অফিস-আদালত– বাজার সহ যে-কোনও পরিষ্কার জায়গায় নামায আদায় করতে পারেন। এমনকী প্লেন– ট্রেন বা গাড়িতে— যেখানে দাঁড়িয়ে নামায পড়াও সম্ভব নয়– সেখানে বসেও ইশারার মাধ্যমে নামায পড়া যায়। স্টËষ্টার সঙ্গে বান্দাহ্র সম্পর্কে কোনও জড় পদার্থের ইমারত যাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় তাই এই বিধান। রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন ঃ ‘আমার এবং আমার উম্মতের জন্য সমগ্র যমীনকে মসজিদ ও পবিত্র বানানো হয়েছে।’ (আবূ দাউদ)
তবুও স্বাভাবিক অবস্থায় নফল নামায গৃহে পড়তে উদ্বুদ্ধ করা হলেও ফরয নামায স্টËষ্টার ঘর মসজিদে জামায়াত সহকারে আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকী সঙ্গত কারণ ছাড়া মসজিদ ত্যাগকারীকে চরম সাবধানবাণী শুনিয়ে বলা হয়েছে ঃ ‘আমার মন চায় যারা আযানের ধ্বনি শ্রবণ করেও মসজিদে আগমন করে না– তাদের গৃহসমূহকে ভস্মীভূত করে দিই’ (বুখারি)। মুসনাদে আহমাদে অন্য এক হাদিসে হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেছেন ঃ আল্লাহ্র রাসূল সা. বলেছেন ঃ ‘যদি ঘরে নারী ও শিশুরা না থাকত– তাহলে আমি যুবকদের নির্দেশ দিতাম– সেইসব ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে– যে সব ঘরের লোকেরা আযান শোনার পরও মসজিদে এশার নামায়ের জামায়াতে হাজির হয়নি।’

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে– নামাযের জন্য মসজিদ একান্ত প্রয়োজন। তবে অবস্থা সাপেক্ষে যে-কোনও পবিত্র জায়গায় নামায জায়েয। যেমন রোগাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য শায়িত অবস্থাতেও নামায পড়া বৈধ। তার অর্থ এই নয় যে স্বাভাবিক অবস্থায় নামাযের জন্য ‘ক্বিয়াম’ বা দণ্ডায়মান হওয়া আবশ্যিক বা অপরিহার্য নয়। অবস্থা সাপেক্ষে শূকরের মাংস ভক্ষণ করাও বৈধ– তার মানে এই নয় যে– শূকরের মাংস হালাল। অনুরুপে– মসজিদের বাইরে নামায বৈধ হলেও তার অর্থ এই নয় যে– মসজিদের প্রয়োজন নেই বা তা অত্যাবশ্যক নয়। বরং মসজিদ আবশ্যিক এবং তা ইসলামি সমাজ ও বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

লেখক অধ্যাপক – গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় 

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
হাসান আলি Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
হাসান আলি
Guest
হাসান আলি

সহমত পোষণ করি।।