সব ধর্মের শাস্ত্রবিদরা এ বিষয়ে একমত যে ধার্মিক মানুষের উপাসনার জন্য যে মনঃসংযোগ– সংযম ও আত্মনিবেদন প্রয়োজন– তার জন্য স্বতন্ত্র উপাসনাগৃহ অত্যাবশ্যক। ইসলামে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। সব ধর্মের ক্ষেত্রেই বলা যায়– উপাসনা কেন্দ্র না থাকলে উপাসনার ফল যেন অসম্পূর্ণ। সারা পৃথিবীতে কয়েক লক্ষ উপাসনালয়ে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি মানুষ যান শুধু একনিষ্ঠতায় আত্মনিবেদনের জন্য। ফলে সেগুলির প্রয়োজনীয়তা অনিবার্যতায় পর্যবসিত হয়েছে। বিশেষ কোনও একটা ইস্যুকে সামনে রেখে সেই অনিবার্যতাকে নস্যাৎ করা যেন গোলাপের কাছ থেকে তার সুগন্ধ হরণ করা।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যাঁরা সাহসের সঙ্গে বলছেন– মসজিদ মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য নয়– তাঁরা আর একটু সাহসী হয়ে বলবেন কি— মন্দির হিন্দুদের জন্য– গির্জা খ্রিস্টানদের জন্য– বৌদ্ধবিহার বৌদ্ধদের জন্য– গুরুদোয়ারা শিখদের জন্য এবং মঠ ও মিশন রামকৃষ্ণানুরাগী স্বামী মহারাজদের জন্য অপরিহার্য নয়? এটা যদি তাঁরা বলতে পারেন এবং মানাতে পারেন– তাহলে এ দেশ প্রকৃত অর্থেই মানব শিশুর বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে ধর্ম তথা উপাসনাস্থল নিয়ে কিছু চরম সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ মানুষের ঘৃণ্য রাজনীতি বন্ধ হবে– বাঁচবে হাজার হাজার নরনারীর মান-সম্ভ্রম– ধন-প্রাণ। তবে এ কথা বলার আগে তাঁদের তা বলার যোগ্যতা ও অধিকার অর্জন করতে হবে। তাহলেই কেবল তা অনেকের কাছে মান্যতা পাবে। বিষয়টির গুরুত্ব এইখানেই। যাঁরা বলছেন– মসজিদ মুসলমানদের উপাসনার জন্য অপরিহার্য নয়– তাঁরা কি মুসলিম শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ? বিশেষজ্ঞ না হয়ে চরম কথা বললে কিন্তু বিশেষ অজ্ঞতারই পরিচয় দেওয়া হবে। তার ফলে পুরাতন সমস্যার সমাধান তো হবেই না– বরং নতুন সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।

আমরা সকলেই জানি– যাঁরা নিজেদের আইনজ্ঞ বলে দাবি করেন– তাঁরাও সব সময় অভ্রান্ত নন— তাই লোয়ার কোর্টের রায় হাইকোর্টে এবং হাইকোর্টের রায় সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হয়ে যায়– আর এক বেঞ্চের রায় অন্য বেঞ্চে অসার প্রমাণিত হচ্ছে তো নিত্যই। তাই আমার হাতে হাতুড়ি আছে– তার মানে এই নয় যে– সময় জ্ঞাপক ঘণ্টা না বাজিয়ে মৃতু্যঘন্টা বাজিয়ে দেব! আবার এখনই ঘটল একটা মন খারাপ করা ব্যাপার। এ রকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে তিনজন বিচারকের মতৈক্য ছিল একান্ত জরুরি। কিন্তু ঘটল মতানৈক্য। এখানে মতানৈক্য মানে বিভাজনের রেখাটিকে প্রশস্ততর করা। মতানৈক্য হল– অথচ এটিকে বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর আবেদন খারিজ করা হল। প্রসঙ্গত– একটি ইংরেজি দৈনিকে কিছুদিন আগে প্রকাশিত– সিনিয়র অ্যাডভোকেট শ্রীদুষ্মন্ত দাভের একটি দুঃসাহসিক নির্ভেজাল মন্তব্য মনে পড়ে গেল— “Most judges are either not competent or not courageous or too politically inclined.” অর্থাৎ অধিকাংশ বিচারক হয় উপযুক্ত নয়– নয়তো সাহসী নয়– অথবা তাঁরা অতিমাত্রায় রাজনীতি প্রভাবিত। গণতন্ত্রে বিচার-বিভাগের স্থান সর্বোচ্চ।

সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটল– যাকে বিচার বিভাগের ইতিহাসে কালো দিন বলা যায়— সুপ্রিম কোর্টের চারজন সিনিয়র বিচারপতি প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন– আর এ দলে ছিলেন নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতিও। প্রসঙ্গত– শবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের অবাধ প্রবেশের পক্ষে রায় দিয়েছেন যে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ– তাঁদের মধ্যে একমাত্র মহিলা বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেছেন– কোনও ধর্মাচরণ নিয়ে বিচারপতিদের ব্যক্তিগত মতামতের কোনও মূল্য থাকা উচিত নয়। তাঁর আরও মন্তব্য– কোনও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোয় ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নগুলিতে আদালতের হস্তক্ষেপ করা যুক্তিযুক্ত নয়। ধর্মাচরণ মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ২৫ ধারা সব ধর্মের আবশ্যিক যে ধর্মাচরণ– তাকে রক্ষাকবচ দিয়েছে। তিনি আরও বলেন– ধর্মের ক্ষেত্রে সমানাধিকারের প্রশ্নটি সেই ধর্মের অনুগামীদের বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে বিচার করা উচিত। তাই কোন ধর্মাচরণ ঠিক– আর কোনটা বেঠিক– তা আদালতের বিচার্য বিষয় হতে পারে না। একমাত্র সতীদাহের মতো কোনও অসামাজিক কাজ হলে আদালত হস্তক্ষেপ করতেই পারে– অন্য ক্ষেত্রে নয়। বরং সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার ধর্মীয় কমিটির হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। এতো গণতন্ত্রপ্রেমী সব মানুষের মনের কথা।

সব ধর্মের শাস্ত্রবিদরা এ বিষয়ে একমত যে ধার্মিক মানুষের উপাসনার জন্য যে মনঃসংযোগ– সংযম ও আত্মনিবেদন প্রয়োজন– তার জন্য স্বতন্ত্র উপাসনাগৃহ অত্যাবশ্যক। ইসলামে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি হাদিস– বর্ণনায় আবু হোরায়রা (রাঃ)— ‘‘একজন মুসলিম যতবার মসজিদে যাতায়াত করে– আল্লাহ্ ততবারই তার জন্যে বেহেস্তের দ্বার উন্মুক্ত করেন।’’ একজন মুসলমান উপাসনা করেন পুণ্যলাভের জন্য। তিনি বিশ্বাস করেন– পুণ্য সঞ্চয় যত বেশি– ইহকাল ও পরকালে মঙ্গলও তত বেশি। সাধারণ মসজিদে নামায পড়লে ২৫ গুণ– জামে মসজিদে ৫০০ গুণ– মদিনা শরীফের মসজিদে নববীতে ৫০ হাজার গুণ এবং কাবা শরীফে পড়লে ১ লক্ষ গুণ সওয়াব পাওয়া যায়। অধিক মাত্রায় পুণ্যার্জন যেহেতু একজন মুসমানের জীবনের প্রধান লক্ষ্য– তাই মসজিদে নামায পাঠ তার কাছে অপরিহার্য।

ইসলাম তো বটেই– সব ধর্মের ক্ষেত্রেই বলা যায়– উপাসনার জন্য পবিত্র উপাসনা কেন্দ্র না থাকলে– উপাসনার ফল যেন অসম্পূর্ণ। সব ধর্মের কথা ধরলে– সারা পৃথিবীতে কয়েক লক্ষ উপাসনালয় আছে। আর সেখানে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি মানুষ যাতায়াত করেন শুধু একনিষ্ঠতায় আত্মনিবেদনের জন্য। এর ফলে সেগুলির প্রয়োজনীয়তা অনিবার্যতায় পর্যবসিত হয়েছে। বিশেষ কোনও একটা ইস্যুকে সামনে রেখে সেই অনিবার্যতাকে নস্যাৎ করা যেন গোলাপের কাছ থেকে তার সুগন্ধ হরণ করা। আছে কোন নরাধম– এই বিধানকে খুশি মনে মেনে নেবে?

লেখক: সেখ হাসান ইমাম, প্রাক্তন প্রধানশিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of