শবরীমালা মন্দিরে নারীদের প্রবেশাধিকার সম্পর্কিত সুপ্রিম কোর্টের রায়– আর তার বিরুদ্ধে আরএসএস– বিজেপি– বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আয়াপ্পা ভক্তদের তুমুল বিক্ষোভে সৃষ্টি হয়েছে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির। প্রশ্ন– রজস্বলা নারীদের কি ধর্মীয় অধিকার নেই? এ সম্পর্কে ইসলামই বা কী বলে? সমস্যাটির সমাধানের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন এ এইচ ইমরান

শবরীমালায় নারী-সমস্যা

শবরীমালা মন্দিরে ১০ থেকে ৪৫ বছরের মহিলাদের প্রবেশাধিকার নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে– তা এখন সকলেই জানেন। সমস্যার মূলে রয়েছেন– ঋতুমতী মহিলারা। বেশ কিছু ধর্মে এবং জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ঋতুমতী মহিলাকে ‘অশুচি’ গণ্য করা হয়। তাই তাদের ওই মন্দিরে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। এখন সুপ্রিম কোর্ট মহিলাদের ব্যক্তি-স্বাধীনতার কথা বলে এ নিয়ম বাতিল করে দিয়েছে। আর তা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির। এখন দেখা যেতে পারে– পৃথিবীর অন্য ধর্ম ও সভ্যতা ঋতুমতী মহিলাদের কী চোখে দেখে– তাদের সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করা হয়? এ বিষয়ে আমরা ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সভ্যতার বিষয়টি আলোচনা করব। কিন্তু তার আগে দেখা যেতে পারে– শবরীমালা মন্দিরে সমস্যাটি কীভাবে সৃষ্টি হল। শবরীমালা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ ভারতের কেরালা– তামিলনাড়ু– অন্ধ্রপ্রদেশ প্রভৃতি এলাকার আয়াপ্পা ভক্ত হিন্দুদের প্রবল বিক্ষোভ সারা দেশকেই নাড়া দিয়েছে। এরপর মাঠে নেমেছে বিজেপি ও আরএসএস। বিজেপি ঋতুমতী মহিলাদের শবরীমালায় প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। বিজেপি ও আরএসএস-এর নেতাকর্মীরাই সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও শবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ রোখার জন্য জবরদস্তি বাধা সৃষ্টি করে। এরপর কেরলের বামপন্থী সরকার ২৫০০-রও বেশি বিজেপি ও আরএসএস নেতাকর্মীকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করার জন্য গ্রেফতার করলে বিজেপি-র সভাপতি অমিত শাহ কেরলে এসে প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছেন– আর একজনেরও গ্রেফতারি হলে কেন্দ্র কেরলের রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করবে। যদিও পর্যবেক্ষকরা বলছেন– এই ধরনের কোনও ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় সরকার পারে না কারণ এই সামান্য কারণে সরকার ফেলে দেওয়ার কোনও সুযোগ বা ধারা সংবিধানে নেই। কিন্তু শবরীমালা বিষয়টি যে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে– তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস

শবরীমালায় ঋতুমতী বয়সের কিশোরী ও মহিলাদের প্রবেশের ওপর মন্দির কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। মন্দির কতৃর্পক্ষের বক্তব্য হচ্ছে– নিষেধাজ্ঞা এজন্য জারি করতে হয়েছে– মহিলাদের মধ্যে কে ঋতুমতী বা ঋতুমতী নয়– তা আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। আর সেজন্যই ১০ থেকে ৫০ বছরের মহিলাদের মন্দিরে প্রবেশ করতে নিষেধ জারি ছিল। মন্দিরের ট্রাস্টি এবং পুরোহিতদের বক্তব্য– ঋতুমতী অবস্থায় মহিলারা ‘অশুচি’ বলে পরিগণিত হন। তাই তাদের শবরীমালার আয়াপ্পা মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। কারণ মন্দিরের প্রতিষ্ঠিত দেবতা আয়াপ্পা চিরকুমার। তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করেন। ঋতুমতী মহিলারা মন্দিরে প্রবেশ করলে ‘আয়াপ্পার ক্রোধ’ নেমে আসবে এবং মন্দিরও অপবিত্র হয়ে যাবে। তাই নির্দিষ্ট ওই বয়সের নারীদের আয়াপ্পার মন্দিরে প্রবেশের উপর প্রথমাবধি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ১৯৫০ সালে একবার শবরীমালা মন্দিরে ‘নাশকতার ফলে’ আগুন লেগে যায় বলে মন্দির ট্রাস্টি বোর্ডের ধারণা। মন্দির পুনর্নির্মাণের পর প্রথামতো মন্দিরটির শুদ্ধিকরণ ও দেবতাকে স্নান করিয়ে সেগুলি পুনরায় পবিত্র করা হয়। কেরালার সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই ঘটনাটির বিরাট প্রভাব পড়ে। নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী হলেও তৎকালীন সিপিআই প্রতিশ্রুতি দেয় যে– তারা ক্ষমতায় এলে এই ধরনের ঘটনার প্রতিকার হবে এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি হবে না। অনেকে বলে থাকেন– এই শবরীমালার ঘটনার প্রভাবেই কেরালার কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাচু্যত হয় এবং ভারতে সর্বপ্রথম অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া কোনও রাজ্যে ক্ষমতা গ্রহণ করে। ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদ মুখ্যমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হন। কিছুদিন আগে এক জনস্বার্থ মামলায় বলা হয়– শবরীমালা মন্দিরে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা মহিলাদের জন্য অপমানজনক এবং সংবিধান প্রদত্ত সমানাধিকারের খেলাপ। মামলাটিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়– মন্দির কর্তৃপক্ষ আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞা অসাংবিধানিক। এতে মহিলাদের মৌলিক অধিকারকে ক্ষু] করা হয়েছে। তাই এই নিয়মটি খারিজ করা হল। মহিলাদের উপর এই ধরনের কোনও নিষেধাজ্ঞা চলবে না।

অশান্তির শুরু

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পরেই তোলপাড় শুরু হয়। একদিকে যেমন সেকুলারবাদী– নাস্তিক ও হিন্দু উদারবাদী এবং নারী মুক্তিকামীরা শবরীমালা নিয়ে শীর্ষ-আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানান– অন্যদিকে মন্দিরের ট্রাস্টি ও পুরোহিতরা বলেন– শীর্ষ আদালতের এই রায় চরম দুর্ভাগ্যজনক। তবে তাঁরা শীর্ষ আদালতের বিরোধিতা করবেন না। আয়াপ্পা ভক্ত নারী-পুরুষদের বক্তব্য ছিল– কোনোমতেই ঐতিহ্য ভেঙে তাঁরা ঋতুমতী বয়সের নারীদের মন্দিরে প্রবেশ করতে দেবেন না। আর তাই কেরালায় শুরু হয়ে যায় রায়ের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ। আর এই প্রতিবাদ মিছিলে বহু নারীও অংশগ্রহণ করেন। এ রায়ের পরবর্তীতে শবরীমালা মন্দির পূর্ব নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। মন্দিরে প্রবেশ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মহিলারা পাহাড়ি পথ ও জঙ্গল পেরিয়ে শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আয়াপ্পা ভক্তদের প্রবল বাধায় তা বানচাল হয়ে যায়। বাধাদানকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন বিজেপি ও আরএসএস কর্মী। এমনকি– ব্যাপক পুলিশি ব্যবস্থাও মহিলাদের মন্দিরে ঢোকাতে পারেনি। নির্দিষ্ট দিনক্ষণ দেখে মন্দিরটি আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে পুনরায় মন্দির খোলার পর কী অবস্থা দাঁড়াবে– তা ভেবে কেরল সরকার প্রবল দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

মেয়েরা রজস্বলা হলে অশুচি কেন হবে?

সত্য হল– মেয়েদের ঋতুমতী হওয়া হচ্ছে একটি স্বাভাবিক– সহজাত বায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়া। এই বিষয়টিকে ‘অশুচি’ কিংবা অস্পৃশ্যতার সঙ্গে যুক্ত করার পিছনে কোনও ধরনের যৌক্তিকতা নেই। তবুও দেখা যায়– নেপালে হিন্দু কোনও মহিলা বা কিশোরীর ঋতুস্রাব হওয়া মাত্র তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে করুণা করে তাকে থাকতে দেওয়া হয় গোয়াল ঘরে কিংবা এজন্য খড় ও মাটি দিয়ে তৈরি কোনও অস্বাস্থ্যকর ঘরে। ভারতেও ঋতুমতী মহিলাদের ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বহু জায়গায় তাদের রান্নাঘরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। খাবারের থালা ধরতে দেওয়া হয় না এবং রয়েছে এই ধরনের অনেক প্রতিবন্ধকতা। সুদূর কেনিয়াতেও ঋতুমতী মেয়েদের প্রতি একই ধরনের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা জারি রয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও সমাজ থেকে তা দূর করা সম্ভব হয়নি। আসলে মেয়েদের মাসিক ঋতুচক্র হল একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়াকেই কোনও কোনও ধর্ম ও সভ্যতায় অশুচি– অপবিত্র বলে মনে করা হয়। আর তা থেকেই সমস্যার শুরু। শবরীমালা-বিবাদেও রজস্বলা মেয়েরাই কেন্দ্রবিন্দু।

সমস্যা এখন যে জায়গায়

প্রশ্ন উঠেছে– এর সমাধান কোন পথে? কারণ– বন্যাবিধ্বস্ত কেরালায় এখন পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজ পিছনে চলে গেছে। বড় হয়ে উঠেছে শবরীমালা নিয়ে দু’পক্ষের বিবাদ ও বিক্ষোভ। এর মধ্যে এক পক্ষ হচ্ছে কেরালার বামফ্রন্ট সরকার। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলেছেন– সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তাঁর সাংবিধানিক কর্তব্য। আর তাই তিনি মহিলাদের ওই মন্দিরে প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা করতে বাধ্য। প্রথম পর্যায়ে যারা গণ্ডগোল করেছিল এবং মহিলাদের প্রবেশ করতে দেয়নি– সরকার তাদের প্রায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করেছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে– বিষয়টি ক্রমশ আরও বেশি করে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে। সেইসঙ্গে শুরু হয়েছে ধর্মীয় রাজনীতি এবং এই ইস্যুটিকে ব্যবহার করে ভোটে ক্ষমতা হাসিলের চেষ্টা। সবথেকে মজার অবস্থান নিয়েছে বিজেপি ও আরএসএস। তারা প্রথমে বলেছিল– শবরীমালা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে প্রত্যেকেরই স্বাগত জানানো উচিত। কিন্তু যখন দেখা যায়– আয়াপ্পা-ভক্তরা এই রায়কে মেনে না নিয়ে প্রতিবাদে শামিল হয়েছে তখন তারা সুর পাল্টে বলে– জনগণের মনোভাবকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং রাজ্যের বামপন্থী সরকারের উচিত ছিল খুব তড়িঘড়ি না করে সুপ্রিম কোর্টে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন পেশ করা। পর্যবেক্ষকরা বলছেন– শবরীমালা ইস্যু রাজ্যের উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের সামনে এক বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। তা তারা আঁচ করতে পেরেই এখন কায়দা করে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরোধিতা করছে। যে আয়াপ্পা-ভক্তরা বিক্ষোভ– শোভাযাত্রা করেছে তাদের মধ্যে এক বড় অংশই ছিল আরএসএস-বিজেপির কর্মী ও ক্যাডার। একজন আরএসএস ও বিজেপি-ঘনিষ্ঠ অভিনেতা তো এতটাই বলে ফেলেছেন যে– যেসব নারী শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করার জন্য জোরাজুরি করছে তাদের দুই পা দু’দিকে টেনে ছিড়ে ফেলা উচিত। অবশ্যই এসবের পিছনে রয়েছে কেরালার বামপন্থী কিংবা কংগ্রেসি শক্তিকে হঠিয়ে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করা এবং ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিজেপির পক্ষে মানুষকে প্রভাবিত করা। রাজনীতি বাদ দিয়েও বলা যায়– মহিলাদের ঋতুচক্রের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করলে মানবসভ্যতাই থাকবে না। তাই মহিলাদের ঋতুকালীন অবস্থায় তাদের অশুচি কিংবা অস্পৃশ্য গণ্য করাটা অমানবিক ও এক ধরনের অপরাধ। তাহলে শবরীমালা নিয়ে যে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি হিন্দু সমাজের মধ্যে তৈরি হয়েছে তার সমাধান কী?

এ সম্পর্কে ইসলামী ব্যবস্থাপনা

এই প্রেক্ষিতে আমরা ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং রীতিনীতির দিকে তাকাতে পারি। ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এবং মুসলিম সমাজে কখনোই মহিলাদের মাসিক রক্তস্রাব কিংবা ঋতুচক্র নিয়ে বিন্দুমাত্র সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়নি। আর এর কারণ– ঋতুস্রাবের সময় মহিলারা অশুচি কিংবা অস্পৃশ্য হয়ে যায়— এই ধরনের কোনও ধর্মীয় কিংবা সামাজিক ধারণা মুসলিমদের মধ্যে নেই। নেই কুরআন কিংবা হাদীসেও। ইসলাম রজস্রাবকে মহিলাদের প্রতি ‘দেবদেবী’ কিংবা ‘ঈশ্বরের শাস্তি’ বলে মনে করে না। এই সময় মহিলারা ‘অশুচি’ হয়ে যান— এ ধরনের কোনও ধারণা ইসলামে নেই। ইসলামে শুধু বলা হয়েছে– ঋতুকালীন সময়ে মহিলারা ইবাদাত বা উপাসনার নির্দিষ্ট কয়েকটি আচারানুষ্ঠান থেকে বিরত থাকবে। তা বলে তাদের ইবাদাত বা উপাসনায় ঘাটতি থেকে গেল কিংবা তারা ‘বঞ্চিত’ হওয়ায় ঈশ্বরের কাছে তাদের সওয়াব বা পুণ্য হ্রাস পেল বা হ্রাস পেল মর্যাদা— এমনটি এক্ষেত্রে ভাবার কোনও অবকাশ নেই। তারা কয়েকটি উপাসনা থেকে বিরত থাকলেও তাদের পুণ্য-প্রাপ্তি কিংবা মর্যাদা আল্লাহ্তায়ালা বিন্দুমাত্র হ্রাস করেন না। বরং ওই নিষেধগুলি মেনে চলাই আল্লাহ্র কাছে সমান পুণ্য বলে গণ্য হয়। এ সময় যদি রজস্বলা মেয়েরা আল্লাহ্কে স্মরণ করতে থাকেন এবং আল্লাহ্র নির্দিষ্ট অন্যান্য কাজগুলি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেন– তবে তারা আল্লাহ্র নিকটবর্তী ব্যক্তি বলে গণ্য হবেন। এ ছাড়া ঋতুকালীন অবস্থায় মহিলারা কখনও আল্লাহ্র নিকট থেকে দূরে রয়েছেন— এমনটি ভাবা হয় না। তিনি যে-কোনও পুরুষের মতোই আল্লাহ্র নিকটবর্তীই রয়েছেন এবং ঈশ্বর তার প্রার্থনাও সমানভাবে শুনে থাকেন। অনেক ইসলামী বিশেষজ্ঞ মেয়েদের ঋতুচক্রকে আল্লাহ্র নেওয়ামত বা বিশেষ দান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ– রজস্রাব না হলে কোনও মহিলার পক্ষেই সন্তান ধারণ সম্ভব নয়। অথচ– আল্লাহ্তায়ালা পুরুষ ও নারীর জন্য সন্তান ও পরিবার প্রতিপালনকে বিশেষ পুণ্যের কাজ বলে বর্ণনা করেছেন। মানব সভ্যতার অগ্রগতির জন্যই এর প্রয়োজন। কোনও কোনও সাহাবা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন– স্ত্রীদের ঋতুকালীন সময়ে তারা তাদের প্রতি কী ধরনের ব্যবহার করবেন? আল্লাহ্র নবী (সা.)-এর জবাব ছিল– তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সব ধরনের স্বাভাবিক ব্যবহার করতে পার– কেবল যৌন সহবাসে লিপ্ত হয়ো না। একবার উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশা (রা.)-কে নিয়ে আল্লাহ্র নবী (সা.) হজ করতে যাচ্ছিলেন। মক্কার কাছে একটি জায়গায় এসে হযরত আয়েশা (রা.) রজস্বলা হয়ে পড়েন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁকে কাঁদতে দেখেন। হযরত আয়েশা হয়তো ভাবছিলেন– তাঁর হজ বাতিল হয়ে যাবে। নবী (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন– এটা অবশ্যই এমন একটা বিষয় যা আল্লাহ্তায়লা আদম (আ.)-এর কন্যাদের সম্পর্কে লিখে রেখেছেন। তুমি হজের আচার পালন করতে পারবে শুধুমাত্র তাওয়াফ ছাড়া। সে সময়ের ইহুদীরা ঋতুস্রাব হলে নারীদের কাছে যেতেন না। তাদের সঙ্গে পানাহার করতেন না এবং এক বাড়িতে থাকতেনও না। কিন্তু আল্লাহ্র নবী (সা.) বলেন যে– ‘তোমরা স্ত্রীর সঙ্গে যৌনমিলন ছাড়া আর সব কিছুই করতে পার।’ ইসলাম এই সময়ে মেয়েদেরকে অশুচি বা অস্পৃশ্য মনে করে না। নবী (সা.)-র স্ত্রী মা আয়েশা (রা.) বলেছেন– একবার যখন তিনি রজস্বলা ছিলেন তখন নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কোলে মাথা রাখেন এবং তিনি কুরআন শরীফ পড়তে থাকেন। তাঁরা এক পাত্র থেকে পানিও পান করেন। এর দ্বারা বোঝা যায়– রজস্বলা মহিলাদের ইসলাম কখনোই ‘অপবিত্র’ গণ্য করে না। তাদের নামায পড়া মাফ করা হয়েছে। রমযান মাসে রোযা রাখার ওপরও ছাড় রয়েছে। ওই সময়ে নামায না পড়লেও তার সওয়াব বা পুণ্য থেকে ওই মহিলারা বঞ্চিত হবেন না এবং রোযা পালনের ক্ষেত্রেও একই কথা। তবে পরে সুস্থ অবস্থায় মহিলাদের কাযা রোযা রাখতে বলা হয়েছে। আসলে ইসলাম রক্তকেই পবিত্র নয় বলে মনে করে– তা সে সুস্থ মানুষের শরীর থেকে বহির্গত হলেও। তাই যদি কোনও মুসলিম নারী কিংবা পুরুষের শরীর থেকে কেটে বা ছড়ে গিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়– তাহলে তার রোযা ভেঙে যায় এবং অজুও নষ্ট হয়ে যায়। রক্ত বন্ধ করে নতুনভাবে অজু করার পরই সেই নারী বা পুরুষ নামায পড়তে পারবে। কেন সুস্থ মানুষের বহমান রক্তকেও অশুচি গণ্য করা হয়— তার নানারকম কারণ আছে। তবে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা বলেন– রক্তের মধ্যেই নানারকম রোগের জীবাণু থাকে। আর সেজন্যই রক্ত পরীক্ষা করে টাইফয়েড– ম্যালেরিয়া– জন্ডিস– ডেঙ্গু– এইডস্ ইত্যাদির শনাক্তকরণ হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞান এবং সব সভ্যতাতেই মাসিকের রক্তস্রাবকে দূষিত বলে গণ্য করা হয়।

যেভাবে নারীরা প্রবেশ করতে পারেন শবরীমালায়

এখন প্রশ্ন হচ্ছে– শবরীমালায় যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধান কি শুধুমাত্র আইন করে কিংবা পুলিশ-প্রশাসন দিয়ে করা সম্ভব? এক্ষেত্রে কিন্তু মনে হয়– সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা আরও ধৈর্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে রায় দিলে ভালো হত। এখানে উল্লেখযোগ্য যে– ওই বেঞ্চেরই একজন মহিলা বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা সংখ্যাগুরু পুরুষ বিচারপতিদের সঙ্গে একমত হননি। শবরীমালা ইস্যুতে তিনি পৃথক রায় দিয়ে বলেন– ‘সমস্ত ধরনের এক্সক্লুসন (বাইরে রাখা কিংবা গণনা না করার) অর্থই বঞ্চনা কিংবা অস্পৃশ্যতা নয়।’ তিনি আরও বলেন– ‘প্রাচীন ধর্মীয় আচার ও নিয়মগুলির বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার অর্থ দাঁড়ায়– ধর্ম ও বিশ্বাসকে যুক্তিসঙ্গত করে তোলার প্রয়াস যা কিন্তু আদালতের আওতার বাইরে।’ অনেকেই বলছেন– ওই মামলায় মহিলা বিচারপতির অভিমতকে গুরুত্ব দিলে হয়তো শবরীমালা নিয়ে এই ধরনের এক অগ্নিগর্ভ সংকটের সৃষ্টি হত না। কাজেই দেখা যাচ্ছে– সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে শবরীমালা নিয়ে বিরাট বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে। বিজেপি ও কিছু হিন্দু সংগঠন সুপ্রিম কোর্টের রায়কে মান্য না করার জন্য প্রকাশ্যেই প্ররোচনা দিচ্ছে। এতে সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা বা ‘কনটেম্পট অফ কোর্ট’ হচ্ছে কিনা তা অবশ্য জানা যায়নি। তাহলে এই সমস্যার সমাধান কোন পথে? দেখা যাচ্ছে– শবরীমালার ঘটনায় মেয়েদের ঋতুচক্রই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। একই ধরনের সমস্যা ইসলাম ধর্মের অনুসারী নারীদের ক্ষেত্রেও হতে পারত। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ইসলাম অনুসারীদের জন্য কখনোই মেয়েদের ঋতুচক্র ‘সমস্যা’ হয়ে দাঁড়ায়নি। আগেই এই নিবন্ধে বলা হয়েছে– ইসলাম নারীদের কী চোখে দেখে। নারীদের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়াকে ধর্মের ক্ষেত্রেও কীভাবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। অনেকেই বলছেন– নারীদের রজস্বলা হওয়ার বিষয়টিকে ইসলামের দৃষ্টিতে দেখলেই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। ইসলামে প্রত্যেক নারীরই পুরুষদের মতোই ইবাদত বা উপাসনা করার অধিকার রয়েছে। আর তাদেরও পুরুষের মতো সমান পুণ্য অর্জন বা সওয়াব হাসিলের সুযোগ রয়েছে। সে জন্য রজস্বলা অবস্থায় মেয়েদের নামায পুরোপুরি মাফ। আর সে সময়ে নারীরা রোযা রাখতে না পারলেও– পরে অবশ্য তার কাযা আদায় করতে হয়। এক্ষেত্রেও মেয়েরা সমান পুণ্যই অর্জন করে। কিন্তু ইসলামে কখনোই কোনও ইমানদার নারী– তা সে দশ বছর কিংবা ৪৫ বছরেরই হোক না কেন– কোনোদিনই এ সম্পর্কে আল্লাহ্র বিধানকে উল্লঙ্ঘন করে না। সে যখন পাক-পবিত্র থাকে তখনই সে মসজিদে প্রবেশ করে নামায আদায় কিংবা পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে পাঠ করে। অবশ্য পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই বিধান। নাপাক অবস্থায় কোনও পুরুষও নামাষ আদায় কিংবা কুরআন স্পর্শ করে পাঠ করে না। যদি আয়াপ্পা-ভক্ত হিন্দু নারীদের ওপরেই বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়– তাহলে ধর্মপ্রাণ কোনও নারী ‘অশুচি’ অবস্থায় আয়াপ্পার মন্দিরে প্রবেশ করবে না। কারণ সে জানে সেক্ষেত্রে ঈশ্বরের রোষ নেমে আসতে পারে। অবশ্য যদি তিনি রজস্বলা না থাকেন তাহলে তাঁর মন্দিরে প্রবেশের কোনও বাধা থাকতে পারে না। আর তা চিহ্নিত করার জন্য নারী পুলিশ বা নারী পাণ্ডার কোনও প্রয়োজন নেই। ধর্মপ্রাণ হিন্দু নারীরাই স্বয়ং তা নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of