শাহ আমানের ইন্তেকাল হয়েছিল ৩১ জানুয়ারি ১৯১৯। তারিখটা দেখেই বুঝতে পারছেন– আর দু’মাস বাকি তাঁর মৃত্যু শতবার্ষিকীর। মুহাম্মদ আজিজ এবং তাঁর ভাই আনিসুন্নবির অনেক পরিকল্পনা ছিল উপযুক্ত মর্যাদার সঙ্গে এলাকার মান্য পির তাঁদের পরদাদা শাহ আমানের শতবার্ষিকী উরস পালন করবেন। ইনশা আল্লাহ্ তা হবে– কিন্তু দুঃখের বিষয় আজিজ থাকবেন না। আজিজের আকস্মিক অকালমৃত্যু শুধু তাঁর সংগীত-অনুরাগীদেরই নয়– এই মাজারের সঙ্গে স্মৃতিতে ও ভক্তিতে যুক্ত সকলের পক্ষেই এক আঘাত।

জাহিরুল হাসান

অনেক স্মৃতিই ভিড় করে আসছে। এই তো ক’দিন আগেই শাহ আমান লেনে গেছি। ওই পথটার সঙ্গে যে আমার আজন্ম যোগ। ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা আমার ভগিনীতুল্য ড. সালেহা বেগম এখন থাকেন ৫বি শাহ আমান লেনে। ওঁর কাছ থেকে একটা বই নেওয়ার ছিল। ঠিকানা দেখে স্মৃতি উথলে উঠল। ওই পাঁচ নম্বরেই তো আমার জন্ম। বেশিদিন ওখানে থাকা হয়নি– অতি শৈশবের সেসব কথা আমার একেবারেই মনে নেই। যৌবনের শুরুতে একবালপুর এলাকায় আসা-যাওয়ার সূত্রে পরে বহুবার ওই গলি দিয়ে হেঁটে গিয়েছি। কিন্তু পাঁচ নম্বর বাড়ির দিকে তাকানোর কথা ভাবিনি। কারণ তখনও জানতাম না সেটাই আমার জন্মস্থান। আব্বা মারা যাওয়ার পর আমার হাতে আসে ওঁর বিয়ের কাবিলনামা। উর্দুতে লেখা– সেখান থেকেই ঠিকানাটা পাই— ৫, শাহ আমান লেন। একসময় একটাই প্লট ছিল। এখন দু’ভাগ হয়ে গেছে– ৫এ এবং ৫বি। পুরোনো টালির চালের বাড়ি ভেঙে বহুতল হয়েছে– যেমন হচ্ছে সর্বত্র। আগের মানুষরাও নেই। যাঁরা আছেন তাঁরা অধিকাংশই নবাগত।

সুফি পির শাহ আমান আলির নামে ওই রাস্তা। সেখানেই তাঁর পরিবরের বাসস্থান ও মাজার। একসময় ওই বাড়িতেই একটা কর্পোরেশন স্কুল ছিল। আর– সেই স্কুলেই পড়াতেন বাংলার দুই কবি নুরুল ইসলাম এবং আবদুল মজিদ। বয়স্কদের মধ্যে যাঁরা কলকাতার মুসলিম-সম্পাদিত প্রাচীন পত্রপত্রিকার ইতিহাস জানেন– তাঁদের নিশ্চয় মনে আছে– মেটিয়াব্রুজ কানখুলি থেকে নুরুল ইসলাম বের করতেন তাঁর ‘ঝংকার’ পত্রিকা। কোনও বাংলা দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেখে ষোলো-সতেরো বছর বয়সে তাঁকে আমি আমার লেখা একটা গল্প পাঠাই। সেই থেকে আলাপ। এই নুরুল ইসলামের আর-একটা পরিচয়– এখনকার বিখ্যাত ব্যান্ড গায়ক রুপম ইসলামের পিতা তিনি। শিশুবয়স থেকে বাবা-মা’র ঝংকার শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে গেয়ে সংগীতে হাতেখড়ি রুপমের। দ্বিতীয়জন আবদুল মজিদের কথা এখন হয়তো বিশেষ কারও মনে নেই– কিন্তু ওই সময়েই চমৎকার আধুনিক কবিতা লিখতেন তিনি।

শাহ আমান লেন থেকে চলে এলেও পির পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক ছিল অনেকদিন পর্যন্ত। দুই বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিল। পরে আমার এক চাচার বিয়ে হয় ওই বাড়িতে। মুহাম্মদ আজিজের বাবাকে আমি বলতাম দোলারা চাচা। পাড়াতে আজিজ মুন্না নামে পরিচিত ছিল। আমার চেয়ে আট বছরের ছোটো। আমাকে শামিম ভাই বলেই জানত সে। ওর উত্থান চোখের সামনে দেখেছি। কাফলা গাইত– রমযানের সময় যে-গান গেয়ে অল্পবয়সিরা রোযাদারদের ঘুম ভাঙাত একসময় প্রতিদিন সেহরির আগে। ঈদের দিন এলাকার বিভিন্ন কাফলা গোষ্ঠীর মধ্যে গানের প্রতিযোগিতা হত। হাতে শিল্ড নিয়ে হইহই করে বিজয়ী তরুণ গায়করা যাচ্ছে– এ দৃশ্য এখনও চোখে ভাসে। সেই আগের মতো না হলেও কাফলা সম্ভবত আজও বেরোয়। তবে নিজের কানে আর শোনা হয়নি।
একসময় যে কলকাতার মুসলিম মহল্লাগুলিতে প্রচুর সুগায়কের আবির্ভাব হয়েছিল তা কিছুটা এই কাফলার কল্যাণেই। আমার চেয়ে বয়সে ছ’বছরের বড় বশির আহমদ কাছাকাছি ইব্রাহিম রোডে থাকতেন। ষাটের দশকে তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং চলচ্চিত্রের নেপথ্য গায়ক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। তিনি উর্দু গান করতেন– পরে বাংলাদেশে চলে এসে সেখানেও গেয়েছেন। মুহাম্মদ আজিজ এবং বশির আহমদ দু’জনকে দিয়েই আমি পাড়ার সাংস্কূতিক অনুষ্ঠানে গান করিয়েছি। ভাবতে হাসি পায়– আজিজকে আমরা মাত্র দশ টাকা পারিশ্রমিক দিতে পেরেছিলাম। বশির আহমদকে বলেছিলাম সম্প্রীতির অনুষ্ঠান– সাধারণ সিনেমার গান গাওয়া চলবে না। নজরুলগীতির একটা রেকর্ড জোগাড় করে তাঁকে দিতে হয়েছিল। আর তিনি গেয়েছিলেন ধুল কা ফুল সিনেমার সাহির লুধিয়ানবির লেখা গান– তু হিন্দু বনেগা না মুসলমান বনেগা/ ইনসান কি আউলাদ হ্যায় ইনসান বনেগা। তখন চৌষট্টির দাঙ্গা হয়ে গেছে। আমরা যুবকরা পাড়ায় এই ধরনের অনুষ্ঠান করতাম– আমাদের নেতা ছিলেন কংগ্রেসের বিধায়ক এবং পরবর্তীতে সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এ কে এম ইশহাক। মন্ত্রী হবার আগে যেমন– ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধির হারের পর মন্ত্রিত্ব খুইয়ে ফিরে আসার পরও তেমনই তিনি একবালপুর থেকে ট্রামে উঠতেন। প্রায় দিনই আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত– দু’জনে সিটের ধারে রড ধরে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে যেতাম– তাঁর গন্তব্য হাইকোর্ট– আমার আয়কর ভবন।

শাহ আমান মুহাম্মদ আজিজের প্রপিতামহ। পিতামহ হলেন হাফিজ নুরুন্নবি। নামটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে মন চলে যায় কাজী নজরুল ইসলামের প্রসঙ্গে– যাঁরা জানেন নজরুলের জীবনে ওই মানুষটির কী ভূমিকা ছিল তাঁদের তো অবশ্যই। শুনেছি সম্প্রতি বাংলাদেশের এক নজরুল-গবেষক কলকাতায় এসে আজিজদের বাড়িতে গিয়েছিলেন হাফিজ নুরুন্নবি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে। সোলা আনা কবরস্থানে ওঁদের কেনা জমিতে হাফিজ নুরুন্নবির কবরটিও দেখে এসেছেন তিনি। নজরুলের সঙ্গে হাফিজ নুরুন্নবির সম্পর্কের কথা তাঁর জীবনীকাররা লিখেছেন। রানিগঞ্জের শিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে আরবি-ফারসি পড়াতেন হাফিজ নুরুন্নবি। তাঁর পরামর্শেই নজরুল সংস্কূত ছেড়ে ফারসি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নিয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে নজরুল যখন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য’ পত্রিকায় ‘ব্যথার দান’ নামে গল্প লেখেন– নায়কের নাম দেন নুরুন্নবি। পরে অবশ্য বই আকারে বেরোনোর সময় নামটা পালটে দেন শিক্ষককে ব্রিটিশের পুলিশ হেনস্থা করবে সম্ভবত এই ভয়েই। কারণ– মুক্তি সেবক সংঘের সঙ্গে নায়কের যোগ দেখানো হয়েছে তাতে। নুরুন্নবির মৃত্যু হয় ২২ আগস্ট ১৯৪৩। নজরুল জীবনীকার সুশীলকুমার গুপ্ত জানিয়েছেন– কলকাতার খিদিরপুরের বাসিন্দা হাফিজ নুরুন্নবি সাহিত্য রুচিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন এবং কাব্যমণ্ডিত উর্দু গদ্য লিখতেন। তাঁরই সাহচর্য ও শিক্ষকতার গুণে নজরুলের মনে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়। আর– নজরুলের লেখার পাঠক মাত্রই বোঝেন যে তার এক বিশাল অংশই ফারসির রসে সিঞ্চিত।

মুজফ্ফর আহমদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’-য় হাফিজ নুরুন্নবিকে নিয়ে আলাদাভাবে আড়াই পৃষ্ঠা লিখেছেন। তিনি নুরুন্নবিকে বন্ধু বলে দাবি করেছেন এবং সেটা অমূলক নয়। ১৯১৫ সালে মুজফ্ফর আহমদ অল্পদিনের জন্য খিদিরপুর জুনিয়র মাদ্রাসায় ইংরেজি পড়িয়েছিলেন– তখন নুরুন্নবি ছিলেন সেখানকার হেড মৌলবি। সেই বছরই তিনি মাদ্রাসা ছেড়ে শিয়ারসোল স্কুলে শিক্ষক পদে যোগ দেন। নজরুল ফৌজ থেকে বেরিয়ে কলকাতায় চলে আসার পর একদিন মুজফ্ফর আহমদ তাঁকে নিয়ে খিদিরপুরের শাহ আমান লেনে (আমরা ছোটোবেলায় ওই গলিটাকে আমান শা লেন বলে জানতাম) হাফিজ নুরুন্নবির বাড়িতে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন– নুরুন্নবি নজরুলকে তুই সম্বোধন করতেন– ছাত্রের সঙ্গে শিক্ষকের এতটাই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মুজফ্ফর আহমদ ১৯২৩ সালে জেলে যাবার আগে পর্যন্ত নুরুন্নবির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বজায় ছিল– তবে তিনি যে কমিউনিস্ট সেকথা সম্ভবত নুরুন্নবি জানতেন না। ১৯৪০ সালে মুর্শিদাবাদের নবাবের লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক হয়েছিলেন নুরুন্নবি। তার আগে ১৯৩০ সালের জুন মাসে সরকার তাঁকে খান সাহেব উপাধিতে সম্মানিত করে।

হাফিজ নুরুন্নবির পিতা শাহ আমান আলি ইসলামি শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও সুফি মেজাজের মানুষ ছিলেন। দিল্লি থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তাঁর কলকাতায় আসা। মহাত্মা গান্ধিসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দের অনেকেই তাঁর বাড়িতে এসেছেন ইসলাম ও পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা শোনার জন্য। এ ব্যাপারে মুহাম্মদ আজিজের ভাই এবং মাজারের বর্তমান খাদিম আনিসুন্নবি অনেক তথ্যই দিতে পারবেন। আনিস উর্দু ভাষার প্রতিষ্ঠিত গল্পলেখক। ‘পরিন্দে’ নামে তাঁর একটি গল্পসংকলন আছে। খুবই পরিশীলিত রুচির মানুষ। দিল্লি থেকে উর্দু ভাষায় এমএ করেছেন। তাঁর মেয়ে ও একমাত্র সন্তান দিল্লিতেই সুপ্রিম কোর্টের তরুণ আইনজীবী। ব্রিটিশ আমলের কলকাতার বিখ্যাত আইনজীবী ও কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম অসরকারি চেয়ারম্যান সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক শাহ আমানের ভক্ত ছিলেন। তাঁরই হস্তক্ষেপে শাহ আমানের কবর সাধারণ কবরস্থানে না হয়ে তাঁর বাড়ির আলাদা দহলিজে হয়েছিল। তখন রাস্তাটার নাম ছিল একবালপুর বাই লেন। সুরেন্দ্রনাথ মল্লিকের উদ্যোগে তার নতুন নাম হয় শাহ আমান লেন। ওই পরিবারেরই আর-এক সদস্য নুরুন্নবির চাচা ডা. আহমদ হুসেন মেডিকেল অফিসারের চাকরি নিয়ে ত্রিনিদাদে চলে গিয়েছিলেন এবং অবসর গ্রহণের পরও সেখানেই জীবন কাটিয়ে দেন।

শাহ আমানের ইন্তেকাল হয়েছিল ৩১ জানুয়ারি ১৯১৯। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে মাজারে উরস হয়। তারিখটা দেখেই বুঝতে পারছেন– আর দু’মাস বাকি তাঁর মৃত্যু শতবার্ষিকীর। মুহাম্মদ আজিজ এবং তাঁর ভাই আনিসুন্নবির অনেক পরিকল্পনা ছিল উপযুক্ত মর্যাদার সঙ্গে এলাকার মান্য পির তাঁদের পরদাদা শাহ আমানের শতবার্ষিকী উরস পালন করবেন। ইনশা আল্লাহ্ তা হবে– কিন্তু দুঃখের বিষয় আজিজ থাকবেন না। শুনেছি– তিনি চেয়েছিলেন ওইসময় মুশায়রা (কবিসম্মেলন) করাতে। উরসে সাধারণত কাওয়ালিই হয়। আজিজের আকস্মিক অকাল মৃত্যু শুধু তাঁর সংগীত-অনুরাগীদেরই নয়– এই মাজারের সঙ্গে স্মৃতিতে ও ভক্তিতে যুক্ত সকলের পক্ষেই এক আঘাত।

আজিজের দেহ মুম্বই থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হবে এবং পারিবারিক সমাধিভূমিতে সম্প্রতি প্রয়াত তাঁর মায়ের পাশেই তিনি চিরশায়িত হবেন– এটাই তাঁর কলকাতার স্বজনরা ভেবেছিলেন। কলকাতায় জানাযা হলে হাজার হাজার পরিচিত বন্ধুবান্ধব ও অনুরাগী শামিল হতেন– এটা সহজেই অনুমেয়। তবে মুম্বইয়ের বাড়ির লোকেরা মনে করলেন যে তাঁর ভাবগুরু মুহাম্মদ রফির যেখানে কবর হয়েছে সেখানেই দাফন হওয়া সঙ্গত। সেই অনুযায়ী বান্দ্রায় জুহু উদ্যানের বিপরীতে যেখানে রফি ছাড়াও নৌশাদ– তালাত মাহমুদ– খাজা আহমদ আব্বাস– আলি সর্দার জাফরি– সাহির লুধিয়ানবি প্রমুখ মুম্বই চিত্রজগতের অজস্র তারকা সমাহিত– তাঁদের সঙ্গী হলেন কলকাতার শাহ আমান লেনের সংগীতপ্রতিভা মুহাম্মদ আজিজও। মুম্বইয়ে তাঁর সংগীতের উত্তরাধিকার এখন কন্যা সানা আজিজের হাতে। মুহাম্মদ আজিজের আশা ছিল যে তাঁর কন্যা তাঁরই মতো চিত্রজগতে প্রতিষ্ঠা অর্জন করবেন। ইউটিউবে সানার গাওয়া ডুয়েট ‘দমাদম মস্ত কালান্দর’ চাইলে শুনতে পারেন। মুহাম্মদ আজিজের সাক্ষাৎকারও ইউটিউবে দেখা যায়। তাঁর কথা শুনলেই মনে হয়– তিনি শুধু সুগায়কই ছিলেন না– অতিশয় নম্র ও বিনয়ী প্রকৃতির মানুষ ছিলেন– যা তাঁদের সুফি পরিবারের ঐতিহ্যের দান। আল্লাহ তাঁকে জন্নত নসিব করুন।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of