বাবরি মসজিদ, ধ্বংসের অাগে

মুহাম্মদ আলাউদ্দিন


তিন গম্বুজওয়ালা একটা ঐতিহাসিক মসজিদ ছিল। সম্ভবত উত্তরপ্রদেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ ছিল ওটা। মুঘল সম্রাট বাবরের আমলে তৈরি হওয়ায় নাম হয়েছিল বাবরি মসজিদ। ব্রিটিশরাজের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার পর ভারত-পাকিস্তান বাঁটোয়ারার প্রভাব পড়ে এই মসজিদেও। সম্রাট বাবর মন্দির ভেঙে মসজিদ বানিয়েছেন— এই যুক্তি সাজিয়ে আন্দোলনে নামে এক শ্রেণির ‘ধার্মিক’ মানুষ। ব্রিটিশ শাসনেও এই দাবি উঠেছিল– কিন্তু মন্দির ভেঙে মসজিদ বানাবার কোনও প্রমাণ দিতে পারেননি অভিযোগকারীরা। ব্রিটিশ আদালত মসজিদে নামায পাঠের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দু’বছরের মধ্যেই এক রাতের অন্ধকারে মসজিদে অনুপ্রবেশ ঘটে দু’টি মূর্তির। নাম দেওয়া হয় রাম-সীতার মূর্তি। অলৌকিকভাবে নাকি মূর্তির উদয় হয়েছে মসজিদের অভ্যন্তরে– লোকেদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য ছড়িয়ে দেওয়া হয় আজগুবি গল্প। দেশ বাঁটোয়ারায় দিশেহারা মুসলমানরা জোরালো প্রতিবাদ করে উঠতে পারেনি। শুধু অযোধ্যায় নয়– সারা দেশে তারা সংখ্যালঘু– সংখ্যালঘুদের আদালতের উপর ভরসা রাখতে হয়। এটাই নিয়ম। মসজিদের ভিতর থেকে মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশাসন ও আদালতে আবেদন জানানো ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিল না। ধর্মের দেশ ভারত– গণতন্ত্রের দেশ ভারত– এখানে আদালতে ইনসাফ পাওয়া যাবেই এই বিশ্বাসে ভরসা রাখতে হয় অযোধ্যার মুসলমানদের। কিন্তু ১৯৪৯ সালে আদালতের মোক্ষম পরিভাষা ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা)-য় মসজিদে মূর্তির অনুপ্রবেশ স্বীকৃতি পেয়ে যায়। কেন্দ্রের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু উত্তরপ্রদেশের দায়িত্বশীলদের নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন– মসজিদের ভিতর থেকে অবিলম্বে মূর্তি বের করে আনার জন্য। রাজি হননি তৎকালীন ফৈজাবাদের প্রশাসক ডেপুটি কমিশনার কে কে নাইয়ার। দিল্লির ধর্মনিরপেক্ষ নেতারা নিশ্চুপ হয়ে যান। মসজিদের শাহাদাতের সূচনা হয়েছিল সেই সময়েই।

ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় দাবিদার কংগ্রেস দিল্লির মসনদে বসে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছে বহু বছর। কংগ্রেস আমলেও অযোধ্যার মুসলমানরা ইনসাফ পায়নি। সংবিধান ও আইনের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ‘আস্থা’-র প্রতি ঝুঁকে পড়তে হয়েছে কংগ্রেস সরকারকেও। কখনও আদালতের মাধ্যমে– কখনও প্রশাসনিক নির্দেশে চেষ্টা করা হয়েছে এক শ্রেণির মানুষের আস্থাকে মর্যাদা দেওয়ার নামে অপর এক পক্ষের দাবিকে দাবিয়ে রাখতে। মসজিদে নামায পড়ার দাবি ওঠে মুসলমানদের পক্ষ থেকে– অপর পক্ষের দাবি ওঠে মসজিদের অভ্যন্তরেই পূজার্চনা করার অধিকার দিতে হবে। বর্তমান কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধির পিতা রাজীব গান্ধি তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সময়েই বাবরি মসজিদের বন্ধ তালা খুলে দেওয়া হয়— নামাযের জন্য নয়, ভিতরে রাখা ‘রাম-সীতার’ মূর্তি দর্শনের জন্য। ১৯৪৯ সালে ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে অন্ধকারে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া মূর্তি যা এত বছর ‘স্ট্যাটাস কো’র গেরোয় আটকে ছিল– রাজীব জামানায় সেটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল।

শুধু অযোধ্যার বাবরি মসজিদ নয়– ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে তৈরি ঐতিহাসিক মসজিদ জবরদখলের আওয়াজ জোরালো হতে থাকে। কট্টর গেরুয়াবাদীরা ওইসব মসজিদের নামের তালিকা প্রকাশ করে ছড়িয়ে দিতে থাকে উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য। অপরদিকে রামমন্দির আন্দোলন তীব্র করার জন্য পৌরাণিক গ্রন্থ রামায়ণকে নিয়ে আসা হয় রাজনীতির প্ল্যাটফর্মে। দশ হাজার কিলোমিটার রথযাত্রার সূচনা হয় বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানির উদ্যোগে। ‘মন্দির ওহি বনেঙ্গে’ দাবি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গেরুয়া শিবির। রাজ্যস্তরের নেতাদের মধ্যে মুলায়ম সিং যাদব ও লালুপ্রসাদ যাদব গেরুয়া শিবিরের পরিকল্পনা বানচাল করার চেষ্টা করেন। কমরেড জ্যোতি বসুর পশ্চিমবঙ্গ সদর্পেই অতিক্রম করে যায় আদবানির রথ, কিন্তু বিহারে রথ সমেত আদবানিকে গ্রেফতার করে নজির সৃষ্টি করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি দলগুলি ত্রিশূল বাহিনী প্রস্তুতি করতে শুরু করে দেয় অযোধ্যা অভিযানের জন্য। প্রতীকী নাম দেওয়া হয় ‘করসেবা’। সম্পূর্ণ ধর্মীয় আচার পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অযোধ্যায় সমাবেশের আয়োজন হয় ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে। কেন্দ্রে তখন কংগ্রেসের নরসিমা রাও-এর সরকার আর উত্তরপ্রদেশে বিজেপির কল্যাণ সিং মুখ্যমন্ত্রী। সারা দেশের নজর অযোধ্যার করসেবার দিকে। প্রতীকী করসেবা করা হবে, পূজা-অর্চনা, ভজন সহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালনে আপত্তি করেনি কেন্দ্রের ধর্মনিরপেক্ষ সরকার। সেইসঙ্গে বাবরি মসজিদের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে হয় রাজ্য সরকারের পুলিশের উপর, আর প্রধানমন্ত্রী ভরসা রাখেন মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতির উপর। বাবরি মসজিদ ঘিরে রাখা হয় পিএসি জওয়ান মারফত। রাজ্য পুলিশকে সহায়তা করার জন্য কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবকও নিয়োগ করা হয়। স্বেচ্ছাসেবকরা আরএসএস সদস্য ছিল বেশিরভাগ। ‘মন্দির ওহি বনেঙ্গে’— মন্ত্র বুকে জপছে যারা, তাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাবরি মসজিদ প্রহরায়।

মসজিদের অদূরে রাম চবুতরা বানানো হয়েছিল পূজার্চনার জন্য। সাধু-সন্ন্যাসীদের ব্যাপার হিসেবে তা মনে করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবি ছিল সেনা নামানোর, কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ ছিল না তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চ্যবনের। নিশ্চুপ ছিলেন কংগ্রেসের সেকুলার নেতারাও। ১৯৯২ সালের ৫ ডিসেম্বর অযোধ্যায় জমায়েত হয় লক্ষাধিক করসেবক– ধর্মীয় আচার পালনের জন্য। তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য ছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি, উমা ভারতী, সাধ্বী ঋতাম্ভরা, অশোক সিংঘল, বিনয় কাটিহার আর স্বনামধন্য সাধু-সন্ন্যাসীরা। ৬ ডিসেম্বর দিনটা ছিল রবিবার। গোটা দেশের মানুষের নজর ছিল অযোধ্যার ঘটনাবলির দিকে। উপস্থিত ছিল দেশ-বিদেশের মিডিয়াও। ফৈজাবাদের পুলিশ সুপার ডিবি রাই সেদিন মিডিয়া কর্মীদের বলেছিলেন, সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আপনারা ফিরে যান এবং একটু বিশ্রাম করুন। কিন্তু এই প্রেসবার্তার পরই কেড়ে নেওয়া হয় তাঁদের ক্যামেরা। মহিলা সাংবাদিকদের কাপড় ছিড়ে দেওয়া হয়। নিগৃহীত হন বহু সাংবাদিক। পূজা-আর্চা ও ভজন বন্ধ রেখে উন্মত্ত করসেবকরা নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেঙে উঠে পড়ে মসজিদের উপর। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চড়তে থাকে মসজিদের গম্বুজে। সঙ্গে নিয়ে আসা শাবল গাঁইতি ছাড়াও ছিল চওড়া ইমারত ভেঙে ফেলার আধুনিক যন্ত্রপাতি। নিরাপত্তা বাহিনী সুযোগ করে দেয় করসেবকদের। একের পর ভেঙে পড়ে মসজিদের গম্বুজ। এক কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা যাচ্ছিল দুপুরের মধ্যে দুইটি ভাঙা গম্বুজ। অযোধ্যার সংবাদ নয়াদিল্লিতে পৌঁছে যায় মুহূর্তেই। কিন্তু করসেবকদের কাছে অসহায় নরসিমা রাও-এর সরকার। উত্তরপ্রদেশেই সেই সময় মজুদ ছিল সেনাবাহিনীর কয়েকটি কোম্পানি। কিন্তু তাদের অযোধ্যা যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না।

মুঘল সম্রাট বাবরের পাঁজর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে সেই উল্লাসে করসেবকদের সঙ্গে মেতে উঠেছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। সেদিন কেউ জানতে পারেনি, বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিকল্পনা হয়েছিল ১০ মাস আগে থেকেই। মিডিয়ায় বলা হচ্ছিল প্রতীকী করসেবার কথা, কিন্তু দিল্লি থেকে অযোধ্যা সকলেই জানতেন, ‘মসজিদ শহিদ’ করে দেওয়ার গোপন পরিকল্পনার কথা। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এতটা দুর্বল ছিল না যে, তারা জানতে পারেনি শাবল, গাঁইতি আর যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে আসছে ‘ধর্মপরায়ণ করসেবকরা’। সাধুসন্তদের ব্যাপার ছিল না, রীতিমতো দক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের আনা হয়েছিল দ্রুত ইমারাত ভাঙার জন্য। ৬ ডিসেম্বর একদিকে বিশাল ইমারাত ভাঙার ধুলো, আর অপরদিকে শহরে মুসলিমদের গৃহসম্পত্তিতে লাগিয়ে দেওয়া আগুনের ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে খোঁড়া হচ্ছিল গণতন্ত্রের কবর। মসজিদের মাঝখানের গম্বুজের নীচে রাখা রাম-সীতার মূর্তি আর উপরে করসেবকদের দাপাদাপি। গম্বুজ ভাঙলে ‘বাবরের বিশাল দেহে’ ঢাকা পড়ে যেতে পারে মূর্তি। তাই অবস্থান নির্দিষ্ট করে বের করে আনা হয় সেই মূর্তি। তারপর মসজিদের ভগ্নাবশেষ সরিয়ে পুনরায় রাখা হয় তা সেই গর্ভগৃহে। গেরুয়া শিবিরের দাবি– মসজিদের মাঝখানটাই ‘গর্ভগৃহ’। গর্ভগৃহ উদ্ধারে শুধু ১৫২৭ সালের তৈরি বিশাল মসজিদই শহিদ করা হয়নি– সেইসঙ্গে শহিদ হয়েছেন প্রায় ২ হাজার আল্লাহর বান্দা। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে অযোধ্যার আগুন। দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু মসজিদের উপর আঘাত হানা হয়, সংখ্যালঘুদের গৃহ-সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। চলতে থাকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত। অযোধ্যার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মন্দিরের উপর আক্রমণ হয়। ব্যতিব্যস্ত হতে হয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারকেও। ধর্মীয় স্থান হিসেবে পরিচিত অযোধ্যার বর্বরতায় সমালোচনার ঝড় ওঠে বিদেশেও। রাষ্ট্রসংঘের চাপ আসে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের উপর। সে দেশে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্থান রক্ষা করতে হবে। ভারতে মসজিদ ভাঙা অপরাধ হয়েছে কিনা সেই বিচার আজও হয়নি।

মসজিদ ধ্বংসের ২৬ বছর পার। সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছেছে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলা। ইতিপূর্বে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমি তিনভাগে ভাগ করে একভাগ মসজিদের জন্য নির্দিষ্ট করে রায় দেয়। সেই রায় মেনে নিতে আপত্তি দুই পক্ষেরই। সুপ্রিম কোর্ট এখন বিচার করবে জমির প্রকৃত মালিকানার। রামমন্দির ইস্যু গেরুয়া শিবিরের কাছে জয়ের সিঁড়ি, সে কারণে তারা চাইছিল ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিক। কিন্তু শীর্ষ আদালত শুনানি দেরিতে করার ফয়সালা নেওয়ায় ক্ষুব্ধ গেরুয়া শিবিরের নেতারা। যেভাবে একতরফা মসজিদ শহিদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেইরকম একতরফা মন্দির নির্মাণে নামতে চায় তারা। এমনকি আদালতের রায় তাদের বিপক্ষে গেলেও ‘মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে’ দাবি ছাড়তে চাইছে না তারা। বাবরি মসজিদ ভাঙার দিনটিকে ‘শৌর্য দিবস’ হিসেবে পালন করতে চায় গেরুয়া শিবির। ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির কেউ সংহতি দিবস, কেউ ধিক্কার দিবস পালন করে আসছে ৬ ডিসেম্বর দিনটিতে। দেশের মুসলিমদের বলা হয়েছে ইনসাফ পেতে আদালতের উপর আস্থা রেখে সংযম পালনের জন্য। ২৬ বছর ধরে এই নিয়ম চলে আসছে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of