বুলন্দশহর। এর অর্থ হচ্ছে উঁচু বা প্রখ্যাত শহর। ‘বুলন্দ’ এবং ‘শহর’ দু’টিই উর্দু শব্দ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগীজি তা পরিবর্তন না করা পর্যন্ত নামটি বুলন্দশহর-ই থাকবে। সম্প্রতি এই বুলন্দশহরে যেভাবে সংঘ পরিবারের সমর্থক বিশেষ করে বিজেপি, বজরং দল ও বিশ্বহিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত গো-রক্ষকরা ‘উঁচু মাত্রা’র সহিংস তাণ্ডব চালিয়েছে,  তা এখন আন্তর্জাতিক খবরে পরিণত হয়েছে। সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল, এই তাণ্ডবে নিহত হয়েছেন একজন কর্তব্যপরায়ণ সৎ ও সাহসী পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিং। বলা হচ্ছে, এই উন্মত্ত জনতা তাঁকে কুপিয়ে, পাথর ছুড়ে এবং গুলি করে হত্যা করেছে। ঠিক কীভাবে তিনি নিহত হলেন, তা খানিকটা রহস্যময়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর নিথর শরীর পুলিশের জিপ থেকে ঝুলে রয়েছে। তার আশেপাশে কোথাও তাঁর কোনও সহকর্মী পুলিশ অফিসারের চিহ্ন মাত্র নেই। অর্থাৎ, এই পুলিশ অফিসারকে বাঁচাতে তাঁর সহকর্মীরা পাশে ছিল না।

পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিং-ই আখলাখের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অফিসার ছিলেন। এবং একজন সৎ পুলিশ অফিসার হিসেবে তিনি যথাসম্ভব নিরপেক্ষ তদন্ত করার চেষ্টা করেন। পরে অবশ্য তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর আশা করা গিয়েছিল প্রশাসন ও পুলিশ কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত সুবোধ কুমার সিংয়ের আততায়ীদের চিহ্নিত করে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করবে।
হ্যাঁ, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একটু রাতে বুলন্দশহরে হত্যা ও সহিংসতা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকেন। কিন্তু দেখা যায়, সবকিছু বাদ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী যোগী তাঁর মনোযোগ কেবল গরু হত্যা সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ রাখেন। সরকারি এক বিজ্ঞপিতে বলা হয়েছে, যোগী উচ্চপদস্থ অফিসারদের নির্দেশ দেন– দ্রুত গরু হত্যাকারীদের গ্রেফতার করতে হবে। কিন্তু ওই পুলিশ অফিসারের নিহত হওয়া নিয়ে তিনি কোনও কথা বলেননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিংকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয় এবং একশোরও বেশি গো-রক্ষক তাড়া করে তাঁর গাড়িটিকে চাষের একটি মাঠে আটকে ফেলে।

পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিং এবং তাঁর সঙ্গের পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে জনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। পার্শ্ববর্তী এক গ্রাম্য এলাকায় গরুর কয়েকটি শবদেহ একটি জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেলে উত্তেজনা তৈরি হয়। আর এই নিয়েই সংঘ পরিবারের ক্যাডার ও গো-রক্ষকরা তীব্র অশান্তির সৃষ্টি করে। এই ঘটনায় পুলিশের পাঁচজন জওয়ানও আহত হন। জনতা বেশ কিছু মোটরসাইকেল ও গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। তারা একটি থানাতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয় একজন যুবক সুমিতেরও গুলিতে মৃত্যু হয়। এখন যে ভিডিয়ো পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে সুমিত নামের ওই যুবক হাতে পাথর নিয়ে পুলিশকে আক্রমণ করছে।

প্রেস বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যোগী আদিত্যনাথ তাঁর নৈশ বৈঠকে উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারদের নির্দেশ দেন যে, গরুর হত্যাকারী ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তিকে অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। আর ‘অবৈধ’ সমস্ত মাংসের দোকান বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিংয়ের নিহত হওয়া সম্পর্কে একটি কথাও খরচ করেননি। তবে, পুলিশ সোমবারের ওই ঘটনা নিয়ে দু-দু’টি মামলা রুজু করেছে। একটি হচ্ছে, পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিং ও আর এক যুবকের নিহত হওয়া এবং অন্যটি, গো-হত্যা সম্পর্কে।

জনতাকে প্ররোচিত করে হত্যার প্রধান অভিযুক্ত হচ্ছে যোগেশ রাজ। সে বজরং দলেরও একজন সক্রিয় কর্মী। এই যোগেশ রাজই গো-হত্যার অভিযোগ দায়ের করেছিল। সে এখনও ফেরার রয়েছে। থানায় পেশ করা অভিযোগে যোগেশ রাজ যে স্থানে গরুর শবগুলি পাওয়া গিয়েছিল– তার সংলগ্ন এক গ্রামের ৭ জন লোকের নাম উল্লেখ করে। তার মধ্যে দু’জন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকও রয়েছে। একজনের বয়স ১১– অন্যজনের ১২। এ ছাড়া ৪ জনের নাম ভুয়ো বলেও জানা গিয়েছে। ওই নামের কোনও ব্যক্তি গ্রামটিতে নেই।
ওই বালকদের পুলিশ কম করে ৪ ঘণ্টা থানায় আটক থাকতে বাধ্য করে। পরে সন্ধ্যায় একজন বালকের পিতা বলেন– পুলিশ আমাদের থানায় নিয়ে এসে বেশ কয়েকঘণ্টা আটকে রাূে। তারা দুই বালকের নাম নথিভুক্ত এবং আমার ফোন নম্বরও সংগ্রহ করে। পুলিশ আমাদেরকে হুমকি দেয়– যখনই আমাদের থানায় ডাকা হবে তখনই যেন আমরা থানায় হাজির হই। তবে আটক করলেও ওই বালকদের পুলিশ কোনও প্রশ্ন করেনি। পুলিশ সূত্র থেকে পরে বলা হয়েছে– তদন্তের পরেই কাউকে জেরা কিংবা গ্রেফতার করা হবে। পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে– গরু হত্যার অভিযোগ পাওয়ার পর তারা এফআইআর-এ প্রদত্ত নামগুলি তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য। এখন জানা যাচ্ছে– অভিযোগকারী যোগেশ রাজই পুলিশ অফিসার হত্যায় মূল অভিযুক্ত।

লখনউতে বৈঠক করেই যোগী আদিত্যনাথ হেলিকপ্টারে গোরখপুরে উড়ে যান। তিনি এখানে সাউন্ড অ্যান্ড লাইট-এর এক শো উপভোগ করেন এবং একটি কাবাডি প্রতিযোগিতায়ও উপস্থিত থাকেন। এ দিকে পুলিশ অফিসারের পরিবার অভিযোগ করেছে– সুবোধ কুমার সিংয়ের নিহত হওয়ার পিছনে পুলিশও অন্যতম চক্রান্তকারী। কারণ– তিনি যে নিরপেক্ষভাবে আখলাখ হত্যার তদন্ত করছিলেন তা পুলিশ এবং প্রশাসনের পছন্দ হয়নি। তখন থেকে তিনি একটি মহলের টার্গেটে পরিণত হন।
এ ছাড়াও প্রশ্ন উঠেছে যে– বুলন্দশহরে ওই সহিংসতার সময় তিনি বার বার করে সাহায্য চাওয়া সত্ত্বেও অতিরিক্ত কোনও পুলিশ বাহিনী দিয়ে তাঁকে সহায়তা করা হয়নি। অনেকে এমনকী বিজেপিরও কিছু লোক বলছেন– জঙ্গল ও আখের ক্ষেতের মধ্যে কারা– কী উদ্দেশ্যে গরুর শবদেহ টাঙিয়ে রাখল? বিশেষ করে মাথা ও গরুর চামড়া এমন করে ঝুলিয়ে রাখা হয় যাতে সহজেই লোকের চোখে পড়ে। কেউ ভক্ষণের জন্য গো-হত্যা করলে তারা তো মাংস খাওয়ার জন্য ব্যবহার করবে। এভাবে ক্ষেতের মাঝে ঝুলিয়ে রাখবে না। তাই ওয়াকিফহালমহল বলছে– গরু হত্যার এই প্রদর্শনী করে চিহ্নিত একটি মহল বুলন্দশহরে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে চেয়েছিল। বিশেষ করে সেই সময় তবলিগি জামায়াতের একটি বড় ইজতেমা ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। উন্মত্ত গো-রক্ষকরা সেূানে পৌঁছতে পারলে বড় ধরনের একটি বিপর্যয় হতে পারত। কিন্তু পুলিশ সুবোধ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বে আগেই ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে হামলাকারীদের অন্যসব চক্রান্ত বা পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পুলিশ বলেছে– তারা এই সম্পর্কেও তদন্ত করবে। কিন্তু যোগী রাজ্যে কী ধরনের সুবিচার পাওয়া যাবে– তা নিয়ে অনেকেই সংশয় ব্যক্ত করেছেন।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of