সৈয়দ বদরুদ্দোজা (সালার, তালিবপুর, মুর্শিদাবাদ) – যার মতো আপোষহীন ও সংগ্রামী মুসলিম নেতা বর্তমানে প্রয়োজন!

0
35

সোশ্যাল মিডিয়াতে মুসলিমদের কনভারসেশন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গোটা মুসলিম সমাজ এমন একজন নেতাকে খুঁজছেন যিনি দৃপ্ত কণ্ঠে, নির্ভীকভাবে মুসলিমদের উপর হওয়া অত্যাচার, লাঞ্ছনা ও বঞ্ছনার কথা ব্যক্ত করবেন, যিনি নিজেকে শাসকদলের দেওয়া প্রলোভনের কাছের বিক্রি করবেন না।

এই সংকটকালে মুসলিমরা যখন একজন নিঃস্বার্থ, উপযুক্ত ও সংগ্রামী মুসলিম নেতার খোঁজে চিন্তিত ও হয়রান যিনি নেতৃত্বশূন্য মুসলিম সমাজকে পথ দেখাবেন, তখন এমনই একজন নেতার আলোচনা করা অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। তিনি হলেন আপোষহীন ও সংগ্রামী মুসলিম নেতা সৈয়দ বদরুদ্দোজা।

আমরা বাঙালীরা হয়ত জানি না যে প্রায় ৬০ বছর আগেই ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে অতি সহজেই সমাসীন হতে পারতেন পশ্চিমবঙ্গের এক বাংলাভাষী মুসলমান। অন্যায়ের সাথে সামান্য আপস করলেই তিনি হতেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি। কিন্তু এই লোভনীয় প্রস্তাব দুই-দুইবার পাওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং হাসিমুখে নির্যাতন সহ্য করেন ও ৭ বার দীর্ঘ কারাবাস বরণ করেন।

সৈয়দ বদরুদ্দোজা সাহেব ছিলেন মুসলিম সমাজের এমনই একজন প্রতিনিধি যিনি মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পতাকাকে আজীবন বহন করেছেন। এই অসাধারণ বাগ্মী পুরুষ অকুতোভয়ে, দ্বিধাহীনচিত্তে মুসলমানদের স্বার্থ, অধিকার ও দাবী দাওয়া নিয়ে কথা বলেছেন।

তৎকালীন ভারতবর্ষের মুসলমানদের একান্ত সুহৃদ হিসাবে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখের বিশ্বস্ত সাথী হিসাবে সৈয়দ বদরুদ্দোজা সাহেব শত প্রতিকূলতা ও বৈরী পরিবেশের মধ্যেও একাকী, এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ইনস্টিটিউশনের মতো যেভাবে স্বজাতি ও স্বীয় সমাজের খিদমতের আঞ্জাম দিয়েছেন, তা গৌরবময় ইতিহাস হিসেবে স্মরণীয়, আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরনীয়।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, এই অসাধারণ কর্মবীর ১৯০০ সালের ৪ই জানুয়ারী পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জানা যায়, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রদত্ত এক শাহী ফরমানবলে সৈয়দ বদরুদ্দোজার পূর্ব পুরুষগণকে পাঠানো হয় মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদের তৎকালীন নবাব ভারত-সম্রাটের ফরমান মোতাবেক যে গ্রামে সৈয়দ-পরিবারের বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন, আজও তা ‘সৈয়দ কুলুট’ নামে পরিচিত।

তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি দর্শন শাস্ত্রে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। একই সঙ্গে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রিও লাভ করেন। ছাত্র জীবন থেকেই অসাধারণ বাগ্মী হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন। ১ম বর্ষ আই এ ক্লাসে অধ্যয়নকালেই একটি বিশাল জনসভায় ৪ ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা প্রদান করে তিনি রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। শুধুমাত্র তাঁর বাগ্মিতা তাঁকে সান্নিধ্য এনে দেয় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মতো অসাধারণ ব্যক্তিত্বের।

বাংলা ও ইংরেজিতে তাঁর অপূর্ব বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের দাস, সৈয়দ বদরুদ্দোজাকে সরাসরি কলকাতা কর্পোরেশনের এনটালী মার্কেটের সুপারিনটেনডেন্ট পদে নিয়োগ করেন। সৈয়দ বদরুদ্দোজা নিজেই ১৯৪৩ সালে কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। অবিভক্ত বাংলায় তিনিই ছিলেন কলকাতা করপোরেশনের চতুর্থ এবং সর্বশেষ মুসলমান মেয়র।

১৯৩৩ সালে সৈয়দ বদরুদ্দোজা কলকাতা করপোরেশনের কাউন্সিলার পদে নির্বাচিত হন এবং শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ও সুভাষ চন্দ্র বসুর দুর্লভ সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে কলকাতা করপোরেশনের মেয়র পদে সৈয়দ বদরুদ্দোজা নির্বাচিত হন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ভারত বিখ্যাত ধনকুবের এম এম ইস্পাহানী।

১৯৪৭ সালের পার্টিশনের পর তিনি একজন নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভায় নির্বাচিত হন। ভারতের প্রতিটি চাকুরিতে মুসলমানদের জন্য অন্ততপক্ষে ৫% পদ রিজার্ভ করার জন্য তাঁর প্রস্তাব রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করে।

১৯৫০ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সাড়ে তিন মাসব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় বিপন্ন মুসলমানদের রক্ষা করার প্রয়াসে তিনি দিবারাত্র পরিশ্রম করেন এবং দুই দুইবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান। তাঁর নিরাপত্তার জন্য মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় সশস্ত্র দেহরক্ষীর ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিলে তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৫০ সালে তাঁকে প্রথমবারের মতো সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। সাম্প্রদায়িকদের হাতে কলকাতা চেম্বার অব কমার্সের মি. ক্যামেরুনের প্রকাশ্যে দিবালোকে নির্মম হত্যাকান্ডের পর তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরু কলকাতায় ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হতে বাধ্য হলে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে সৈয়দ বদরুদ্দোজা প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করেন এবং সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র হাওড়ার একটি জুট মিলেই অন্ততপক্ষে ১৭০০ মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

১৯৫৩ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম কনভেনশনের সভাপতি হিসেবে আলীগড়ে সৈয়দ বদরুদ্দোজা ইংরেজি ও উর্দুতে যে সাড়ে চার ঘণ্টাব্যাপী অনলবর্ষী বক্তৃতা দেন তা ভারতে সম্পূর্ণরূপে তাৎক্ষণিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। অদ্যবধি তা ভারতে নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হয়। ঐ এতিহাসিক বক্তৃতার ফলে আলীগড় ও দিল্লির মুসলমানেরা তাঁকে ‘কায়েদ-এ-আকবর’ উপাধি প্রদান করে। কিন্তু ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারত সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। প্রতিবেশি রাষ্ট্রে গোপনীয় সামরিক তথ্য পাচার করার মিথ্যা অভিযোগে সুদীর্ঘ সাড়ে তিন মাস কারারুদ্ধ রাখার পর মধ্য রাত্রিতে এক সদস্যের একটি গোপনীয় ট্রাইব্যুনালের সম্মুখে তাঁকে হাজির করা হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়ে তিনি সুদীর্ঘ চার ঘণ্টার এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা প্রদান করেন। বিমুগ্ধ বিচারক তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ নির্দোষ হিসেবে মুক্তি প্রদানের নির্দেশ দেন।

১৯৫৭ সালে নির্দলীয় সদস্য হিসেবে তিনি পুনরায় বিধান সভায় নির্বাচিত হন। একজন নির্বাচিত সদস্য হিসেবে তাঁকে ১৯৫৮ সালে একটি দলিল স্বাক্ষর করতে নির্দেশ দেয়া হয় যাতে দাবি করা হয় যে, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ – এই মর্মে স্বীকৃতিস্বরূপ প্রণীত একটি দলিলে (Kashmir Memorandum) পশ্চিমবঙ্গ বিধনাসভার প্রত্যেক মুসলিম সদস্যকে স্বাক্ষর করতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৫৮ সালে নির্দেশ প্রদান করে। তদানীন্তন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ কাজেম আলী মির্জা ব্যক্তিগতভাবে বর্ষীয়ান নেতা সৈয়দ বদরুদ্দোজার বাসায় গিয়ে তাঁকে ওই দলিলে স্বাক্ষর করতে অনুরোধ করেন। তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তার অসম্মতির কথা জানিয়ে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন।

ভারতীয় পত্রপত্রিকায় বদরুদ্দোজার এই কথিত ধৃষ্টতা অমার্জনীয় অপরাধরূপে চিহ্নিত করে তার কঠোর শাস্তি দাবি করা হয়। দেশদ্রোহিতার অপরাধে অভিযুক্ত করে বিধান সভায় তার ‘বিচার’ শুরু হলে সৈয়দ বদরুদ্দোজা অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে ঘোষণা করেন, ধর্মনিরপেক্ষতাভিত্তিক ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী, কোনো দিনও শুধু মুসলমানদের ওই Kashmir Memorandum-এ স্বাক্ষর প্রদান করে ভারতের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করার নির্দেশ দেয়া যায় না। হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর যদি স্বাক্ষর না করতে হয়, তাহলে শুধু মুসলমানেরা কেন স্বাক্ষর করতে যাবে? তিনি একই সাথে নির্ভীকচিত্তে ঘোষণা করেন :

“If love of my religion and community is a crime, I am a criminal and I am proud to be branded so. If a man has no love for his own religion, no respect for his own parents, no regard for his own community, he is either a hypocrite, a scoundrel or a liar.”

অসাধারণ বাগ্মী সৈয়দ বদরুদ্দোজার বলিষ্ঠ প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নাতি সিদ্ধার্থ শংকর রায় ও কুখ্যাত মীরজাফরের বংশধর সৈয়দ কাজেম আলী মির্জা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ওই Kashmir Memorandum সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর আর কখনো ভারতের মুসলমানদের এ ধরনের অন্যায় ও সংবিধানবিরোধী দলিলে স্বাক্ষর করতে বলা হয়নি।

সৈয়দ বদরুদ্দোজা উক্ত দলিল স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তাঁকে অভিযুক্ত করার জন্য এবং সেই সঙ্গে সদস্য পদ বাতিল করে অন্যান্য কঠোর শাস্তি প্রদানের প্রয়াসে বিধান সভার একটি বিশেষ অধিবেশনে সৈয়দ বদরুদ্দোজা বীরদর্পে ঘোষণা করেন যে, তিনি ভারতীয় সংবিধানের প্রতি অনুগত, কিন্তু কংগ্রেসী প্রশাসনের কাছে বিন্দুমাত্র অনুগত নন। তাঁর অকাট্য যুক্তি ও সুতীব্র বাগ্মিতার চাপে অভিযোগ উপস্থাপনকারী মন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় (পরবর্তী পর্যায়ে যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন) এবং মীরজাফরের বংশধর নওয়াব কাজেম আলী মির্জা তাদের মিথ্যা অভিযোগ বিনা শর্তে প্রত্যাহার করতে এবং ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, এই দুর্দম মুজাহিদের কণ্ঠরোধ করার জন্য কংগ্রেস সরকার ১৯৫৮ সালেই তাঁকে শিক্ষামন্ত্রী হবার জন্য সরাসরি প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু তিনি মুসলিম-বিরোধী সরকারের সে প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।

১৯৬২ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি একই সঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভা-তে নির্বাচিত হয়ে ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে এক রেকর্ড সৃষ্টি করেন।

১৯৬২ সালে লোকসভায় প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতায় তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতায় তিনি ঘোষণা করেন যে, স্বাধীনতার পর ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার শিকার হিসেবে ভারতে কমপক্ষে ১০ লাখ মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্য করা হয়েছে। তাঁকে দমিয়ে রাখার জন্য ১৯৬৩ সালে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রী অথবা পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর হবার জন্য তাঁকে পুনরায় কংগ্রেস সরকার প্রস্তাব পাঠালে তিনি পূর্বের ন্যায়ই তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। লোকসভায় প্রদত্ত তার ভাষণে তিনি নির্ভীকভাবে ঘোষণা করেন :

Secularism is a sneer and a delusion, it is a fraud and a deception. Secularism! Thy name is hypocrisy, thy name thy is name is treachery, thy name is perfidy, thy name is corruption, thy name is victimisation of the weaker people, using them as pawns on the political chess-board by thy powers that be in the land of aggrandisement, thy name is exploitation of the minority, particularly of the Muslim minority–all in the name of the security of the state, all in the name of the sovereignty of the state, all in the name of the so-called Republic of india.

ভি ভি গিরির নির্বাচনে কংগ্রেসের পক্ষে সিপিএমের সমর্থন পাইয়ে দিতে বদরুদ্দোজার প্রয়াসের স্বীকৃতি প্রদানে এবং মুসলমানদের অধিকতর সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে দুইবার প্রস্তাব দেন ভারতের রাষ্ট্রপতি হতে। প্রতিবারই তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন শুধু একটি কারণে, কথিত ধর্মনিরপেক্ষ, যা আসলেই লোকদেখানো, ভুয়ো ও মেকী, তাকে তিনি কখনো গ্রহণ করেননি। একে তিনি শঠতা, প্রবঞ্চনা ও সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের নিপীড়ন ও বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া মনে করতেন।

প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ইন্দিরা গান্ধী তার সাথে সরাসরি আলোচনা করার জন্য বদরুদ্দোজাকে আমন্ত্রণ জানান। আলোচনাকালে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিক সেবা করার বাসনা জানিয়ে ইন্দিরা বলেন : ‘হামে ভি মওকা দিজিয়ে মুসলমানো কে খিদমত করনে কি।’

উত্তরে সৈয়দ বদরুদ্দোজা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাকে জানিয়ে দেন : ‘আপ মেহেরবানি কর কে খিদমত কিজিয়ে। মুসলমান কওম আপকে পিছে দওড়েগা। সঁইকড়ো বদরুদ্দোজা রোকাওয়াট পয়দা করনে সে ভি ওহ রোকেঙ্গে নেহি। আপহি কে পিছে দওড়েগা। ম্যয় আল্লাহ কা নাচিয বান্দা। মামুলি আদমি। আপ খিদমত করনে সে বদরুদ্দোজা কি কোই জরুরত নেহি পড়েগি। বেশুমার মুসলমান হাম-আহাঙ্গ হোঙ্গে আপ হি কা সাথ।’

স্পষ্টভাষী বদরুদ্দোজার এই বক্তব্য ইন্দিরা গান্ধী পছন্দ করেননি। তিন-তিনবার বদরুদ্দোজাকে জেলে যেতে হয় (এর আগেও তিনি চারবার কারাবরণ করেন) মিথ্যা অভিযোগে। পরিণতি যতই ভয়াবহ বা করুণ, পরিবেশ-পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, সত্য বলতে ভয় পাননি।

মুসলমানদের উপর কোনো নির্যাতন হলে, ভুয়ো ও মেকী ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে তারা শোষিত হলে, সৈয়দ বদরুদ্দোজার প্রতিবাদী কণ্ঠ হুঙ্কার দিয়ে উঠত। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে (যখন ভারত সরকারকে নিরুপায় হয়ে আর্মি তলব করতে হয়) সৈয়দ বদরুদ্দোজার নিরলস পরিশ্রম ও নির্ভীক জনসেবা ভারতীয় মুসলমানদের কাছে চিরস্মরণীয়।

কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ‘রোটান্ডা’ হলে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলজারীলাল নন্দার উপস্থিতিতে মুসলমানদের জান-মাল রক্ষা করার ক্ষেত্রে ভারত সরকারের চরম ঔদাসীন্য, ব্যর্থতা ও ক্ষেত্রবিশেষে ইচ্ছাকৃত গাফিলতির কথা বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করলে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল চন্দ্র সেন তাঁকে বাধা প্রদান করেন এবং থামানোর চেষ্টা করেন । প্রত্যুত্তরে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রচন্ডভাবে ভৎর্সনা করে সৈয়দ বদরুদ্দোজা ঘোষণা করেন-

“Don’t try to interrupt me. I am the last person to be dictated by any human agency None but Allah can stop me. “

সেই রাত্রিতেই সাম্প্রদায়িকতার মিথ্যা অভিযোগে পুনরায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকালে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী তার বাসভবনে তার পরিবারবর্গের সঙ্গে যে অসদাচরণ করে তার জন্য ইস্টার্ন কমান্ডের তদানীন্তন জিওসি-কে লোকসভা সদস্য ত্রিদিব চৌধুরী মারফত ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়।

১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে নির্দলীয় সদস্য হিসেবে তিনি পুনরায় লোকসভায় নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি পদে যখন ভি,ভি, গিরিকে ইন্দিরা গান্ধী সমর্থন দেন, তখন ব্যক্তিগতভাবে তিনি (ইন্দিরা গান্ধী) সি.পি এম-এর সমর্থন আদায়ের জন্য সৈয়দ বদরুদ্দোজাকে ঐকান্তিক অনুরোধ জানান। সৈয়দ বদরুদ্দোজার অভিমতে ভারতীয় রাজনীতিতে ইন্দিরা গান্ধী তখন ‘লেসার ইভিল’ (Lesser evil) বিবেচিত হওয়ায় সি. পি. এম প্রথমবারের মতো ইন্দিরা সমর্থিত প্রার্থীকে (ভি, ভি, গিরি) ভোট দিয়ে জয়ী করে। পুরস্কারস্বরূপ সৈয়দ বদরুদ্দোজাকে ক্যাবিনেট মন্ত্রী কিংবা পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর পদ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হলে তিনি পুনরায় ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

নির্লোভ বদরুদ্দোজার এই প্রত্যাখ্যান ও বলিষ্ঠ মন-মানসিকতা ইন্দিরা গান্ধী ভালো চোখে দেখেননি। অতীতের সকল সাহায্য-সহযোগিতা সস্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়ে তিনি ১৯৭১ সালের ১ জুন সৈয়দ বদরুদ্দোজাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেন। কলকাতা হাইকোর্ট ঐ নির্দেশ অবৈধ বলে রায় দেয়। কিন্তু হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়া মাত্র হাইকোর্টের গেট থেকেই পুনরায় গুপ্তচরবৃত্তির মিথ্যা অভিযোগে বদরুদ্দোজাকে গ্রেফতার করে বিনা বিচারে প্রায় তিন বছর কারারুদ্ধ রাখা হয়।

জেলের অভ্যন্তরে তার দু’বার সিরিয়াস স্ট্রোক হলে নয়টি রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে সৈয়দ বদরুদ্দোজাকে মুক্ত করার জন্য লোকসভায় দাবি পেশ করে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে মুমূর্ষু বদরুদ্দোজা সাহেবের বে’ল মঞ্জুর করা হয়। ১৯৭৪ সালের সাংবাদিকদের তীব্র সমালোচনা ও জনতার প্রবল চাপের মুখে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কার রায় বর্ধমানের একটি জনসভায় অকস্মাৎ সৈয়দ বদরুদ্দোজার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন।

মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় সৈয়দ বদরুদ্দোজা সাহেবকে ৭ বার কারাবরণ করতে হয়। কারাবাসকালে তিনি ‘হযরত মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর শিক্ষা ও অবদান’ শীর্ষক একখানা গবেষণাধর্মী পুস্তক রচনা করেন। ইংরেজি ও ঊর্দু ভাষায়ও তাঁর কিছু অসম্পূর্ণ রচনা রয়েছে। উল্লেখ্য, মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তাকে ভারতের ‘আঞ্জুমানে তারাক্বীয়ে ঊর্দু’-এর পেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। বাংলা ভাষাভাষী অন্য কাউকে অদ্যাবধি এ দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করা হয়নি।

সৈয়দ বদরুদ্দোজা সাহেবের ইংরেজি, বাংলা ও ঊর্দুতে বাগ্মিতা সর্বজনস্বীকৃত। ঊর্দু ভাষায় বক্তা হিসেবে তিনি আবুল কালাম আজাদের সমকক্ষ বিবেচিত হতেন। ইংরেজি ভাষায় ভারতের শ্রেষ্ঠ বাগ্মী হিসেবে তাকে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন স্যার এন্টনী ইডেন, জুলফিকার আলী ভুট্টো, শ্রী রাজাগোপালাচারী ও জ্যোতি বসু।

অসাধারণ কর্মবীর, অনন্য প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী সৈয়দ বদরুদ্দোজা সারা জীবন সাদামাটা, সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করে গেছেন। সামান্য আপোষ করলে তিনি ভারতের শীর্ষতম আসনে অধিষ্ঠত হতে পারতেন।

ব্রিটিশ ভারতে তিনি কলকাতার মেয়র ছিলেন, সুদীর্ঘ ৩৫ বছর ভারতীয় পার্লামেন্ট, বিধানসভা, বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি, লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন।

সামান্য একটু স্বার্থপর হলে অগাধ অর্থ ও প্রাচুর্যের মধ্যে অবগাহন করতে পারতেন। সৎ ও কঠিন ব্যক্তিত্বের মানুষটি কিন্তু তা করেননি। দারিদ্র্য তার দ্বারে করাঘাত করেছে, কারারুদ্ধ থেকেছেন তিনি বহুবার, কিন্তু কোনোদিনও বিচলিত হননি। ক্ষণস্থায়ী সুখ ও প্রাচুর্য্য-মর্যাদার মোহে বিক্রিত হননি।

ব্রিটিশ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী কলকাতার তিনি ছিলেন মেয়র, অবিভক্ত বাংলার কাউন্সিল ও অ্যাসেম্বলীর সদস্য, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলার ঘনিষ্ঠ সহচর, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ও লোকসভার সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুকালে তার নিজের কোনো বিষয়-সম্পত্তি বা বাড়ী ছিল না; ব্যাংকে জমা ছিল না মোটা টাকা। উপমহাদেশের রাজনীতিবিদদের জীবনে এ ধরনের দৃষ্টান্ত নিতান্তই বিরল।
## সংগ্ৰহিত ##

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of