ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে চলত শিশুপাচার– শিশু বিক্রির টাকায় ফতেপুরে প্রাসাদোপম ফ্ল্যাট মূল চক্রীর

0
504


কলম প্রতিবেদক­ সদ্যোজাত ফুটফুটে শিশুদের পাচারের মতো কুর্কীর্তি আড়াল করতে বাজারের ব্যাগকেই ঢাল করেছিল ফলতা শিশুপাচার-কাণ্ডের মিডলম্যান শ্যামল বৈদ্য। পুলিশের জেরার মুখে পাচারকাণ্ডের খলনায়ক জানিয়েছে– ঘুণাক্ষরেও যাতে কারও সন্দেহ না হয়– তার জন্য ব্যাগের মধ্যে সদ্যোজাত শিশুদের লুকিয়ে নিয়ে পৌঁছে দেওয়া দিত বেহালার পূর্বাশা হোমের মালিক পুতুল বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বিভিন্নজনের হাতে। এক-দু’দিন নয় গত ৬ বছর ধরেই শিশুপাচারে এমন নিখুঁত অপারেশন চালিয়ে গিয়েছিল। আর সেই কাজে সাহায্যের দরাজ হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল শিয়ালদার শ্রীকৃষ্ণ নার্সিংহোম সহ আরও একাধিক নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকরা। শ্যামলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। রবিবারই ধৃত শ্যামল বৈদ্য ও তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী বৈদ্যকে তোলা হয়েছিল ডায়মন্ড হারবার আদালতে। শ্যামলকে ১১ দিনের পুলিশ হেফাজত ও তার স্ত্রীকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
দীর্ঘদিন ধরে তক্কে-তক্কে থাকার পরে শুক্রবারই শিশুপাচার-কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করে ফলতার জীবনদীপ নার্সিংহোমের মালিক হরিসাধন খাঁ ও তার ছেলে প্রবীর খাঁকে। বাবা-ছেলে জুটিকে জেরা করেই হদিশ মেলে ফতেপুরের বাসিন্দা শ্যামল বৈদ্য ও তার স্ত্রী সাবিত্রী বৈদ্যের। শনিবার গ্রেফতার করে রাতভর জেরা করা হয় দু’জনকে। তাতেই মেলে কলকাতার যোগসূত্র। শ্যামল জানায়– কুমারী গর্ভবতীদের সন্তানই ছিল মূলত ব্যবসার মূলধন। শিয়ালদার শ্রীকৃষ্ণ নার্সিংহোম সহ একাধিক নার্সিংহোমের চিকিৎসকরা সেইসব কুলগোত্রহীন শিশুদের হদিশ দিতেন জীবনদীপ নার্সিংহোমের মালিককে। এরপরে যোগাযোগ করা হত ঠাকুরপুকুরের পূর্বাশা হোমের মালিক পুতুল বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে বড়দি সহ আরও একাধিক হোমের মালিকের সঙ্গে। তাঁদের হাতেই তুলে দেওয়া হতো সদ্যোজাত একরত্তি শিশুগুলিকে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে– শিশুপাচার-কাণ্ডে মিডলম্যান হিসেবে কাজ করে রাতারাতি ধনী বনে গিয়েছিল শ্যামল। শিশুপাচারের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কমিশন বাবদ পাওয়া মোটা অঙ্কের টাকা পেত। সেই টাকায় ফতেপুরের কাছেই প্রাসাদোপম অট্টালিকা গড়ে তুলেছিল সে। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা শ্যামলের জীবনযাপনেও এসেছিল পরিবর্তনের ছোঁয়া। কিছুদিন আগেই ফ্ল্যাটে নতুন মার্বেল বসানোর পাশাপাশি রং-ও করিয়েছিল।
অন্যদিকে– জলপাইগুড়ি শিশুপাচার-কাণ্ডের মূলচক্রী চন্দনা চক্রবর্তীর আরও দুই ঘাঁটির হদিশ পেয়েছেন সিআইডির তদন্তকারীরা। তাঁরা জানতে পেরেছেন– ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি বাড়াতে ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে তদ্বিরের প্রয়োজনে ভিআইপি রোডে কৈখালির কাছে এক আবাসন ও তেঘরিয়ায় এক বাড়িভাড়া নিয়েছিল জলপাইগুড়ি শিশুপাচার চক্রের মূল হোতা। তেঘরিয়ার বাড়ির মালিক দীপঙ্কর ঢালি জানিয়েছেন– বাড়িভাড়া নেওয়ার সময়ে নিসন্তান দম্পতিদের সন্তান পাইয়ে দেওয়ার হোম চালানোর কথা বলেছিলেন চন্দনাদেবী। সপ্তাহেই দু-তিনদিন এই ভাড়া বাড়িতে আসতেন। ওখান থেকে কাজের প্রয়োজনে যেতেন নেহরু চিলড্রেন হোম ও কলকাতা হাইকোর্টে। বেলেঘাটার কাছে একটি ডায়গনস্টিক সেন্টারও খুলেছিলেন চন্দনার ছেলে। কলকাতায় ঘাঁটি গড়ে শিশুপাচারের জাল আরও বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন কি না– চন্দনা তাও খতিয়ে দেখছেন সিআইডি গোয়েন্দারা।
শিশুপাচার-কাণ্ডে ধৃত দার্জিলিং জেলার শিশু সুরক্ষা আধিকারিক মৃণাল ঘোষকে জেরা করে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন– শুধুমাত্র চন্দনা চক্রবর্তীর সংস্থা নয় শিশুপাচার কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত শিলিগুড়ির কনসার্ন হোম-ও। যার মালিক রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন মহা নির্দেশক ভূপিন্দর সিংয়ের স্ত্রী গোবিন্দ কাউর। ২০০৩ সালে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হয়ে কাজ করার সুবাদে কলকাতা থেকে শিলিগুড়িতে গিয়েছিলেন মৃণাল। ঠিক তখনই কনসার্ন হোমের দেখভালের দায়িত্ব তাঁর কাছে দেন গোবিন্দ কাউর। অস্ট্রেলিয়ার একটি বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ৭ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা অনুদান পাওয়ার কথা রয়েছে কনসার্ন হোমের। কীসের জন্য এই বিপুল অর্থের অনুদান দেওয়া হচ্ছে– তা খতিয়ে দেখছেন সিআইডি আধিকারিকরা।
বাদুড়িয়া– জলপাইগুড়ি– ফলতা—রাজ্যজুড়ে শিশুপাচারের জাল ক্রমশই যেভাবে ফাঁস হচ্ছে তাতেই অশনিসংকেত দেখছেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা। কার্যত কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কেউটের হদিশ মিলছে। ফলে এ বিষয়ে সবিস্তারে তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল গড়ার কথাও ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন নবান্নের শীর্ষ কর্তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here