সৈয়দ সাহাবুদ্দিন ছিলেন মিল্লাতের নেতা ও অনন্য প্রজ্ঞার অধিকারী

0
347

আহমদ হাসান ইমরান
সৈয়দ সাহাবুদ্দিন। তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। ৪ মার্চ পরিণত বয়সে তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে চলে গেলেন। এই মানুষটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এবং দেশভাগ পরবর্তী দিশেহারা মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক– শিক্ষা ও রাজনৈতিক মার্গদর্শনে ৮০-র দশক থেকেই নজিরবিহীন এক ভূমিকা আদায় করেছেন।
তাঁর ইন্তেকালের পর বেশিরভাগ সংবাদপত্র ও ওয়েবসাইটে প্রথমেই তাঁর পরিচিতি হিসাবে বলা হচ্ছে– সৈয়দ সাহাবুদ্দিন ছিলেন বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা। কথাটি অবশ্য ভুল নয়। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দেশের সামাজিক বিন্যাস ও সংবিধানের ওপর এই ভয়ংকর হামলার মোকাবিলা গণতন্ত্র ও আইনের পথে করার জন্য ভারতীয় মুসলমান ও সমমনা উদারজনদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন সৈয়দ সাহাবুদ্দিন। কিন্তু এর থেকেও তাঁর বড় পরিচয় তিনি দীর্ঘদিন সর্বভারতীয় মুসলিম মজলিশে মুশাওয়ারাতের মূল পরিচালক ছিলেন। মুসলিমদের অধিকার প্রতিষ্ঠা– সমস্যাগুলির সমাধান এবং নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় ধরে এক বড় ভূমিকা পালন করে। আর সৈয়দ সাহাবুদ্দিন ছিলেন মুশাওয়ারাতের নীতি নির্ধারক ও সংগঠক।
মরহুম সাহাবুদ্দিন ছিলেন যুক্তিবাদী তুখোড় বক্তা এবং অসামান্য লেখনী প্রতিভার অধিকারী। পার্লামেন্টে তাঁর বত্তৃ«তাসমূহ এর প্রমাণবহ।
জনাব সাহাবুদ্দিন ছিলেন– প্রথম সারির একজন সম্পাদকও। তাঁর ‘মুসলিম ইন্ডিয়া’ পত্রিকা পরিসংখ্যান ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের নিবন্ধ প্রকাশ করত। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা মুসলিম ও দুর্বল শ্রেণির সম্পর্কে এবং দেশে গণতন্ত্রের প্রসার ও ফ্যাসিবাদের উত্থান-সম্ভাবনা নিয়ে যেসব খবর ও নিবন্ধ ছাপাত– সৈয়দ সাহাবুদ্দিন তা ‘মুসলিম ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় তুলে ধরতেন। এই মুসলিম ইন্ডিয়া পত্রিকা ছিল তথ্য সমৃদ্ধ এবং ভারতীয় মুসলিমদের সম্পর্কে এক রেফারেন্স জার্নাল। জনমত গঠনে তা এক বড় ভূমিকা রেখেছিল। মনে রাখতে হবে– সে সময় গুগলও ছিল না– ছিল না ইন্টারনেটও। ছিল না মোবাইল ফোন। কাজেই মুসলিমদের সম্পর্কে সঠিক খবর সম্প্রচারে তাঁর এই পত্রিকাটি এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছিল।
সৈয়দ সাহাবুদ্দিনের বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। দেখেছিলাম ৮০ ও ৯০-এর দশকে উত্তরপ্রদেশ সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যে ভয়াবহ মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা হয় সৈয়দ সাহাবুদ্দিন তাঁর প্রায় সকল অকুস্থলে ছুটে গিয়েছেন। প্রশাসন ও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ক্ষতিগ্রস্তদের সান্ত্বনা প্রদান ও ত্রাণের কাজে তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতেন। অসমে ১৯৮৩ সালে নওগাঁর নেলি ও বিভিন্ন জেলায় যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ও দাঙ্গা এবং গ্রাম জ্বালানোর ঘটনা ঘটে– তাতে তিনি শুধু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর নয় বরং ত্রাণের কাজেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। একই কথা প্রযোজ্য ১৯৯৩-৯৪ সালে নিম্ন অসমে বোড়োদের বড় ধরনের দাঙ্গা ও গ্রাম জ্বালানোর ঘটনাতেও। মণিপুরেও প্রায় একই সময় সেখানকার ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞ চলে। সৈয়দ সাহাবুদ্দিন সেখানেও ছুটে গেছেন এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখে এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেছেন। এ ছাড়া মিরাট– মালিয়ানা– ভাগলপুর প্রভৃতি বড় বড় ভ্রাতৃঘাতী সহিংসাতেও তিনি বহুবার ত্রাণ কর্তার ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর এই সব অবদান অবশ্যই ভারতের জনগণ মনে রাখবে। সৈয়দ সাহাবুদ্দিন সব সময় ছিলেন গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার আর ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের প্রবল বিরোধী।
তাঁর একটি অবদানের কথা অনেকেই জানেন না। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় সৈয়দ সাহাবুদ্দিন ছিলেন আমাদের রাষ্টেÉর একজন প্রথমসারির কূটনীতিক। তিনি ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি রাষ্টেÉ বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কারণ তিনি বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অন্যায় আধিপত্য ও বঞ্চনার বিরোধী ছিলেন। তাই উর্দুভাষী হয়েও তিনি ভারতীয় কূটনীতিক হিসাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের স্বাধীকার ও স্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here