‘ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ রেগুলেটরি কমিশন’ তৈরি করছে রাজ্য সরকার

0
159

কলম প্রতিবেদক ­ নজিরবিহীনভাবে বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমের রোগ সারাতে স্টেরয়েডের থেকেও কড়া দাওয়াই দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঘোষণা করলেন– এই সমস্ত বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের লাগামছাড়া বিল বা চিকিৎসায় অবহেলা দেখালে এবার ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ রেগুলেটরি কমিশন’ তৈরি করছে রাজ্য সরকার।
জীবন বাঁচাতে বিপদে পড়ে বহু মানুষকেই নিত্য বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের শরণাপন্ন হতে হয়। এবার সেই হাসপাতাল বা নার্সিংহোমগুলির নিজস্ব রোগ যেমন মাত্রাতিরিক্ত বিল– চিকিৎসায় অবহেলা– অযথা একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রভৃতি বিষয় নির্মূল করতে নতুন ওষুধ প্রয়োগ করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার কলকাতার টাউন হলে শহরের প্রায় সব প্রথম সারির বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোম কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন– এই সমস্ত জায়গায় চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের আর্থিক এবং মানসিক হয়রানি তিনি কিছুতেই বরদাস্ত করবেন না। তাই এই সমস্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতে লাগামছাড়া বিল বা চিকিৎসার নামে অবহেলা না হয়– তাতে নজর রাখতেই এই কমিশন। এর কাজ হবে– এই সমস্ত হাসপাতালের বিল– পারফরম্যান্স– স্বচ্ছতা খতিয়ে দেখা এবং প্রতিমাসে সেই সংক্রান্ত রিপোর্ট মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়া। কমিশনের মাথায় থাকবেন একজন প্রাক্তন বিচারপতি। আর সদস্য হবেন চারজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ– স্বাস্থ্য সচিব সহ সংশ্লিষ্ট চার দফতরের সচিবরা। দশ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিশন গঠনের বিল আগামী ৩ মার্চ বিধানসভায় পেশ করা হবে। এ ছাড়াও ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট আইনে কিছু সংশোধনী আনার ইঙ্গিতও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রতিনিধিদের নির্দেশ দেন– কোনওভাবেই বিল না মেটানোর অভিযোগে মৃতদেহ আটকে রাখা যাবে না। ওষুধপত্রের দামের দিকটা দেখতে হবে। আপনারা প্রতি হাসপাতালে নিজস্ব খরচায় ‘ন্যায্য মূল্যের ডায়গনিস্টিক সেন্টার’ খুলুন। ক্যানসারের মতো মারণ রোগে আক্রান্ত রোগীদের দিকে বিশেষ নজর দিন। প্রত্যেক হাসপাতালে হেল্প ডেস্ক খুলতে হবে। সমস্ত হাসপাতালকে ই-প্রেসক্রিপশন বা ই-রেকর্ডস বা ডেটা কার্ড রাখতে হবে– যাতে একনজরে রোগীদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তবে– মুখ্যমন্ত্রী এ কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন– রাজ্যের মানুষকে চিকিৎসা সাহায্য দিতে একযোগে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রকে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে তাঁর বার্তা– ‘কখনও ভাববেন না কেউ কারও বিরোধী। এটা একটা গঠনাত্মক আলোচনা। এটাকে ‘পজিটিভ’ হিসেবেই নিন। এ নিয়ে জনগণের অনেক হতাশা রয়েছে। তা যেন আর না বাড়ে– সেটাই আমাদের দেখা দরকার।’
বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে চোখে পড়ার মতো বিলের বহর কিংবা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নতুন হয়। টাকা দিতে না পারার অভিযোগে মৃতু্যপথযাত্রী কোনও রোগীকে এই সমস্ত হাসপাতালের দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ‘অমানবিক’ ঘটনা আকছাড় ঘটছে। একবালপুরে সিএমআরআই -এর মতো হাসপাতালে সময়ে চিকিৎসা না করার অভিযোগে এক কিশোরীর মৃতু্যকে কেন্দ্র করে এই সমস্ত ‘আরোগ্য নিকেতনের’ কঙ্কালসার চেহারাটা সামনে আসে। আর– তাতেই মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করে নেন– ‘এনাফ ইজ এনাফ’। এর একটা হেস্তনেস্ত করার সময় এসে গিয়েছে। আর তারই ফলশ্রুতি এ দিনের টাউন হলের বৈঠক।
বৈঠকের শুরুতেই স্বাগত ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দেন– তিনি তৈরি হয়েই এসেছেন। বিভিন্ন মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে রাজ্যের ২০৮৮ বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের মধ্যে ৯৪২ টিতে সমীক্ষাও চালিয়েছেন তিনি। সেই ফলিত অভিজ্ঞতা থেকেই তালিকা ধরে ধরে– এইসব বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোম প্রতিনিধিদের বুঝিয়ে দেন– বেশকিছু সাধারণ রোগে এই সমস্ত হাসপাতালই আক্রান্ত। সেগুলি হল– বিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব। একই ওষুধ বারবার প্রয়োগ করা। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও প্রায় সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো। বিল বাড়ানোর জন্য আইসিসিইউ বা ভেন্টিলেশনে রোগীকে রাখা– রোগীর পরিজনদের রোগ ও তার প্রকৃত খরচ সম্পর্কে না জানানো– সমন্বয়ের অভাব– বিল না মেটানোর অজুহাতে মরদেহ না ছাড়া প্রভৃতি। এ রাজ্যে চিকিৎসা করাতে এসে লাগামছাড়া বিলের কারণে সর্বস্বান্ত হওয়ার জোগাড় প্রতিবেশী বাংলাদেশ– নেপালের নাগরিকদের। তাঁরাও একই অভিযোগ করছেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাই স্বাগত ভাষণেই তিনি বলেন– ‘ইট– বালির ব্যবসা আর চিকিৎসা এক জিনিস নয়। এটা সেবা– সেই মানসিকতা নিয়েই চিকিৎসা দিতে হবে।’ চিকিৎসা করাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘটি-বাটি বিক্রি করতে হবে কেন? প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রীর। তিনি নিজেই অভিযোগ করেন– ফাইভ-স্টার হোটেলের থেকেও হাসপাতলের বিল বেশি হয়ে যাচ্ছে। এটা কী করে সম্ভব? দিল্লি– মুম্বই-এর সঙ্গে কলকাতার তুলনা টানা যাবে না বলেও তিনি জানিয়ে দেন। কারণ– দিল্লি– মুম্বই বা চেন্নাইয়ের থেকে কলকাতায় অনেক কম অর্থ ব্যয়ে জীবন-ধারণ করা যায়। এই সুর বেঁধে দিয়েই বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের মতামত বা বক্তব্য জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী।
প্রথমেই মুখ্যমন্ত্রীর তোপের মুখে পড়তে হয়– ইএম বাইপাস সংলগ্ন অ্যাপেলো গ্লেনিগেলস হাসপাতালকে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টই জানিয়ে দেন– ‘আপনাদের বিরুদ্ধেই সবথেকে বেশি অভিযোগ। বলুন কী বলার আছে?’ উত্তরে ওই হাসপাতালের সিইও রানা দাশগুপ্ত আমতা আমতা করে বলেন– ‘আপৎকালীন রোগীকে কখনোই ফেরানো উচিত নয়। আমরা কখনও তা করি না। আমরা সিটি স্ক্যান– রেডিয়োথেরাপি ইত্যাদির জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও মেশিন ব্যবহার করছি। সে কারণেই বিল বাড়ছে।’ সঙ্গে সঙ্গেই এই যুক্তি মেনে না নিয়ে প্রতিবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী। বলেন– ‘মেশিন কিনেছেন বলে তার টাকা পেশেন্টদের কাছ থেকে তুলবেন? ধীরে ধীরে তো সেই টাকা তুলতে হবে– না হলে তো সোনার ডিম পাড়া হাঁসই মরে যাবে।’ মুখ্যমন্ত্রী ফের জানতে চান– ‘বিল বাড়ছে কেন?’ তার স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি অ্যাপেলো কর্তা। উলটে তিনি বলে বসেন– ১০ শতাংশ বিনামূল্যের শয্যা আছে তাঁদের হাসপাতালে। বার্ষিক ৬ হাজার টাকার নীচে আয় এমন রোগীদের জন্য ২০ শতাংশ ছাড় দেন তাঁরা। যা শুনে আরও রেগে যান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন– ‘বার্ষিক ৬ হাজার টাকার নীচে আয় কারও আছে না কি? একটা ভিক্ষুকের কত আয় জানেন?’ সরকারের নিয়ম বা চুক্তি না মানার অভিযোগ এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে তুলে মুখ্যমন্ত্রী এগিয়ে দেন স্বাস্থ্যসচিব রাজেন্দ্র শুক্লা। তিনি জানিয়ে দেন– বহুক্ষেত্রে এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে নিয়ম না মানার অভিযোগ রয়েছে। এর পরের পালা বেলভিউ ক্লিনিকের। মুখ্যমন্ত্রী শুরুতেই বলে দেন– ‘এমপি– এমএলএ-রা আপনাদের ওখানে ভর্তি থাকে। কিন্তু– অনেকেই সন্তুষ্ট নয়। চিকিৎসার মান ক্রমাগত কেন কমছে? বেলভিউ-এর সিইও প্রদীপ ট্যান্ডন-এর উত্তর অন্য হাসপাতালে ওখানকার নার্সরা চলে যাচ্ছে। তাই এমন অবস্থা । মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যাপারে নির্দেশ দিলে সমস্যা মিটবে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে থামিয়েই বলেন– নার্সদের মাইনে বাড়ান। তাহলেই তাঁরা থাকবেন। এ ব্যাপারে সরকারের কিছু করার নেই। সরকার কোনও নির্দেশ দিতে পারে কি? প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রীর। সাম্প্রতিক ঘটনা ঠিক হয়নি উল্লেখ করেও সিএমআরআই কর্তাকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন– আপনাদের ওখানেও খুব বেশি বিল হচ্ছে কেন? উত্তরে ওই হাসপাতালের প্রতিনিধি জানান– ৪৭ বছর ধরে তাঁরা পরিষেবা দিচ্ছেন। স্বচ্ছতা যেখানে দরকার সেখানে তাঁরা স্বচ্ছতা আনবেন। সে’সময় মুখ্যমন্ত্রী বলেন– মেডিক্যাল তথ্য রোগীদের অন-লাইনে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। এরপর মেডিকা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তাঁদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়ার সময়েই মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন– ‘আপনাদের বিরুদ্ধে কিডনি পাচার চক্রের সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগ কেন?’ ব্যাখ্যা সঠিক না হওয়াতে মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথিকে এ নিয়ে বলতে বলেন এবং কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে বিষয়টি দেখে নিতে বলেন। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন– কোনও শিশু বা অন্যান্য পাচার চক্র বরদাস্ত করা হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর তথ্য এবং তোপের মুখে পড়ে ভাগীরথী নেওটিয়া মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল এবং যাদবপুরের কেপিসি হাসপাতাল। ভাগীরথী নেওটিয়ার ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে স্বাস্থ্যসচিব জানান– কয়েক দিন আগে এক প্রসূতির মৃতু্যর ঘটনায় অভিযোগ জানানোর জন্য হাসপাতালের কাউকে পাওয়া যায়নি। মা এবং শিশুদের হাসপাতাল হিসেবে আরও দায়িত্বশীল নেওয়ার পরামর্শ দেন মুখ্যমন্ত্রী। কেপিসিও কেন এক অভিনেত্রীর দেহ ছাড়েনি-তা জানতে চান মুখ্যমন্ত্রী। যদিও এরই মাঝে রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠান বা ইসলামিয়া হাসপাতালের কাজের প্রশংসাও করেন তিনি। এভাবেই সওয়াল-জবাব শেষে রোগ নির্মূলের েপ্রসক্রিপশন মুখ্যমন্ত্রী তৈরি করে দেন। যা এক কার্যকরী পদক্ষেপ বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here