আলতামাস কবীর­ কর্মবীরের বর্ণময় জীবন

0
177

কলম প্রতিবেদক­ ছোটবেলাটা কেটেছিল পুরোদস্তুর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। বাবা জাহাঙ্গির কবীর ছিলেন দাপুটে কংগ্রেস নেতা। বিধান রায়ের মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য। চাচা হুমায়ুন কবীর ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিচরণের মহার্ঘ সুযোগ তাঁর সামনে এসেছিল। কিন্তু সেই হাতছানিতে ধরা দেননি আলতামাস কবীর। বরং সারাজীবন রাজনীতির ছোঁয়া থেকে শতযোজন দূরে থেকেছেন। নিজের প্রতি দৃঢ়ü প্রত্যয়ের কারণে রাজনীতির পরিবর্তে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আইন ব্যবসাকে। সেই সিদ্ধান্ত যে কতটা সঠিক ছিল– কালের ইতিহাস তার সাক্ষী হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে দেশের শীর্ষ আদালতের শীর্ষপদ অলংকৃত করেছেন দেশের উজ্জ্বলতম বিচারপতিদের অন্যতম আলতামাস কবীর।
দেশের উজ্জ্বলতম রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান আলতামাস কবীরের আইনের পেশায় আসার পিছনেও এক কাহিনি রয়েছে। স্কুলে যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন ঠিক তখনই সোশ্যাল সায়েন্সের শিক্ষক হানিওয়েল সাহেব একদিন ছোট্ট আলতামাসের কাছে জানতে চেয়েছিলেন– বড় হয়ে কী নিয়ে পড়তে চায় সে। ছোট্ট শিশুর উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই পরামর্শের সুরে বললেন– ‘তুমি ওকালতি পড়ো।’ প্রিয় শিক্ষকের সেই কথা মাথায় ঢুকে গেল। আইন ব্যবসাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিলেন।
আইন নিয়ে স্নাতক হওয়ার পরে শিক্ষানবিশ আলতামাস বাবার হাত ধরেই হাজির হয়েছিলেন তখনকার নামকরা আইনজীবী ও দুঁদে কংগ্রেস নেতা শঙ্করদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। লক্ষ্য ছিল– কিছুদিন সহকারী হিসেবে কাজ শেখার। কিন্তু শঙ্করবাবু পাঠিয়ে দিলেন আর এক প্রখ্যাত আইনজীবী জিতেন্দ্রনাথ ঘোষের কাছে। তিনি আবার পাঠালেন তাঁর ভাগ্নে শেখর বসুর কাছে। চরকির মতো পাক খেয়ে শেষপর্যন্ত শেখরবাবুর জুনিয়র হিসেবে কাজ শুরু করলেন। সালটা ১৯৭৩।
একদিকে জুনিয়র হিসেবে ব্রিফ তৈরি করা– সিনিয়রকে শুনানিতে সাহায্য করার কাজ চলল আর অন্যদিকে নিজেকে সফল আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অদম্য চেষ্টাও চালাতে লাগলেন আলতামাস কবীর। কিছুদিনের মধ্যেই স্বাধীনভাবে মামলা লড়া শুরু হল। অল্পদিনের মধ্যেই কলকাতার আইনজীবী মহলে সুনাম কুড়ালেন। নাম ছড়াল– পাল্লা দিয়ে বাড়ল যশ-প্রতিষ্ঠা। কালো সামলা গায়ে আলতামাস তখন সহকর্মীদের কারও কাছে গর্বের আবার কারও কাছে ঈর্ষার পাত্র। মাত্র ১৭ বছর আইনজীবী হিসেবে কাজ করার পর ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রবোধ দিনকররাও দেশাই একদিন ডেকে বললেন– ‘আলতামাস– তোমায় কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি করতে চাই।’ বিপুল অর্থের হাতছানি ছেড়ে– সাজানো পসারকে বিদেয় জানিয়ে ওই বছরের ৬ আগস্ট কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে শপথ নিলেন।
টানা ১৫ বছর কলকাতা হাইকোর্টে সুনামের সঙ্গে বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। শেষের দিকে অস্থায়ী প্রধান বিচারপতির দায়িত্বও সামলাতে হয়। কলকাতা হাইকোর্টকে বিদায় জানিয়ে ২০০৫ সালের ১ মার্চ ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে যোগ দেন আলতামাস কবীর। ওই বছরেরই ৯ সেপ্টেম্বর দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারপতি পদে যোগ দেন। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৩৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। বিচারপতি সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়ের পরে আরও এক বাঙালি হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সর্বোচ্চ পদে বসার অনন্য সম্মানের অংশীদার হন আলতামাস কবীব। ২০১৩ সালের ১৮ জুলাই প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর নেন এই কিংবদন্তি আইন ব্যবসায়ী। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে মাত্র নয় মাস দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু তার মধ্যেই একাধিক মামলায় তাঁর দেওয়া রায় ঐতিহাসিক রায় হিসেবে আখ্যা পেয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল– প্রিভেনটিভ ডিটেনশনের নামে কাউকে এক বছরের বেশি আটকে রাখা যাবে না। আইনি জটিলতা কাটিয়ে বিহারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা পদে ৩৭ হাজারের বেশি কর্মপ্রার্থীকে নিয়োগ।

সোনার চামচ মুখে দিয়েই জন্মেছিলেন আলতামাস কবীর। অথচ আইনজীবী হিসেবেই হন কিংবা বিচারপতি হিসেবে—সব ক্ষেত্রেই তাঁর নজর ছিল– যাতে গরিবরা উপেক্ষিত না হন। বঞ্চনার শিকার না হন। বর্ণময় কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পরেও বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। ব্যক্তিজীবনে ফুটবল– হকি খেলতে ভালবাসতেন দেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি। গান গাইতেন– শখের নাটকও করেছেন। সারাজীবন মাথা উঁচু করে বেঁচেছিলেন। রবিবার বিষ] সকালেই সব আলোচনা– বিতর্ক– চর্চার |র্ধ্বে চলে গেলেন তিনি। ভারতের আইনের আকাশ থেকে ছিটকে গেল আরও এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র—যাঁর নাম আলতামাস কবীর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here