গাফিলতিতে রোগী মৃতু্যর অভিযোগ–হাসপাতালে ভাঙচুর একবালপুরে

0
169

কলম প্রতিবেদক ­ হাসপাতালের গাফিলতিতে কিশোরী রোগীর মৃতু্যকে কেন্দ্র করে বুধবার ব্যাপক উত্তেজনা ছড়াল একবালপুরের ক্যালকাটা মেডিক্যাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট (সিএমআরআই) হাসপাতালে। মৃতার নাম সাইকা পারভিন (১৫)। স্থানীয় বাদশা খান সেন্টিনারী গার্লস হাইস্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। মৃতার পরিবারের অভিযোগ– হাসপাতাল তাদের থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়েও বাকি ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা জোগাড় করতে দেরি হওয়ার কারণে কোনও চিকিৎসা না করে রোগীকে ফেলে রেখে দিয়েছিল। সেই কারণেই সাইকার মৃতু্য হয়েছে। অবশ্য হাসপাতাল কতৃপক্ষ তা মানছে না। সূত্রের খবর– পাহাড়ে মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনার খবর পেয়ে অসন্তুষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী শীঘ্রই হাসপাতালগুলির সঙ্গে কথা বলবেন এই ব্যপারে। হালে কয়েকজন বিধায়ক বিধানসভায় কলকাতার নামী হাসপাতালের বিল জমা দেন। তাতে যে খরচ দেখানো হয়েছে তা অস্বাভাবিক বেশি। তা নিয়ে স্পিকার মুখ্যমন্ত্রীকে বলেন। মুখ্যমন্ত্রী তখন স্পিকারকে ওই সব হাসপাতাল কতৃপক্ষকে ডাকতে বলেন। বিধানসভার স্বাস্থ্য বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছে। এটা যেমন একটা দিক– পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী নিজেই ভাঙচুর রোধের আইন তৈরির সময় বলেছিলেন– সরকারি হোক– বেসরকারি হোক– ভাঙচুর করা হলে যারা করেছে তাদের থেকে খরচ তোলা হবে। এক্ষেত্রে কী হবে? এখনও অবশ্য বিধানসভায় পাশ হওয়া সেই বিল রাজ্যপালের অনুমোদন পায়নি– তবু হাসপাতাল যখন নৃশংসতার নজির তৈরি করবে তখন কী হবে? এই প্রশ্ন এদিন জিরােফর মতো মাথা তুলেছে বারবার।
হাসপাতাল সূত্রে খবর–û পেটে ব্যথা অনুভব হওয়ায় বুধবার সকালে সাইকাকে সিএমআরআই হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে– কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃতু্য হয়। এরপরেই হাসপাতালে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর শুরু করে মৃতার পরিবারের লোকজন। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি সহ কর্মীদেরও মারধর করা হয়। দফায় দফায় ডায়মন্ডহারবার রোড অবরোধ করেন বিক্ষোভকারীরা।র্ যাফ ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছন ডিসি(সাউথ)প্রবীণ ত্রিপাঠী-সহ ইকবালপুর থানার একাধিক পুলিশ আধিকারীক। তা সত্ত্বেও পুলিশের উপস্থিতিতেও তান্ডব চলতে থাকে বলে অভিযোগ। দু’দফায় ভাঙচুরের পর ডায়মন্ড হারবার রোডে বেশ কিছুক্ষণ অবরোধ চলে। ভোগান্তিতে পড়েন নিত্যযাত্রীরা। সিএমআরআই কর্তৃপক্ষের অভিযোগ– পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যার্থ পুলিশ।
মৃত ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে সিএমআরআই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একবালপুর থানায় লিখিতভাবে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ দায়ের করেছে। লালবাজার সূত্রে খবর– রোগীর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে একবালপুর থানায় অনিচ্ছাকৃত খুন(৩০৪এ) সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। গোটা ঘটনার প্রেক্ষিতে পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি। সিএমআরআই হাসপাতাল থেকে লিখিত বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে– বুধবার ভোরে পেট ব্যাথা নিয়ে সাইকাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু সাইকার পরিবারের অভিযোগ– মঙ্গলবার রাতে ওই হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। রোগী ভর্তির প্রসঙ্গে হাসপাতাল ও রোগীর পরিবারের বক্তব্যে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। ইতিমধ্যেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য খতিয়ে দেখছে পুলিশ। হাসপাতাল সূত্রে খবর– চিকিৎসার জন্য সাইকাকে নিয়ে আসা হলে সিএমআরআই হাসপাতালের পক্ষ থেকে বলা হয়– রোগীর অবস্থা খারাপ। প্রথমেই তাঁকে আইসিইউতে ভর্তি নেওয়া হয়। বলা হয়– রোগীর অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় তাঁর অস্ত্রোপচারেরû প্রয়োজন। এদিকে সাইকার ভাই মহম্মদ জাইদ জানান– হাসপাতালের পক্ষ থেকে অস্ত্রোপচার বাবদ রোগীর পরিবারকে দেড় লক্ষ টাকা জমাও দিতে বলা হয়। প্রাথমিকভাবে ৪০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়। বাকি ৯০ হাজার টাকা জোগাড় করবার সময়ই জানা যায় সাইকার মৃতু্য হয়েছে। হাসপাতালের গাফিলতিতেই সাইকার মৃতু্য হয়েছে বলে তার অভিযোগ। মৃতার পরিবারের আরও অভিযোগ– দেরি করে চিকিৎসা শুরু করার ফলেই তাঁর মৃতু্য হয়েছে। চিকিৎসার আগেই টাকার কথা বলা হয়। অথচ চিকিৎসা সময়মতো শুরু করেনি।
এদিকে সাইকার ভাই মহম্মদ জাহিদের অভিযোগের কথা অস্বীকার করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে– সাইকার অন্ত্রে (পারফোরেশন অব বওল) কয়েকটি ছিদ্র ছিল। যার ফলে রোগী প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছিল। অন্ত্রের এই চিকিৎসার একমাত্র উপায় ছিল অস্ত্রোপচার। পাশাপাশি রোগীর উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও ছিল। এই অবস্থায় রোগীর রক্তচাপ স্বাভাবিক না করে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব ছিল না। তাই অস্ত্রোপচারের আগে উচ্চ রক্তচাপ স্বাভাবিক করার অপেক্ষা করছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু অস্ত্রোপচার হওয়ার আগেই রোগীর প্রচণ্ড ব্যথা হওয়ার ফলে হ*দ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতু্য হয়। তবে চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি– রোগীর পরিবারের লোকজন কোনও কথা না শুনেই হাসপাতালে ভাঙচুর শুরু করেন। প্রায় ১০০ জনের কাছাকাছি মানুষ একসঙ্গে হাসপাতালে ঢুকে পড়ে ও হাসপাতালের কম্পিউটার সহ কয়েক লক্ষ টাকার জিনিসপত্র নষ্ট করে দেয়। রিশেপশনের কাচের দেওয়াল ভেঙে ফেলে কম্পিউটার– প্রিন্টার ছুড়ে ফেলে বিক্ষোভকারীরা। রিসেপশনের চারপাশে ভাঙা কাঁচ– উল্টানো কম্পিউটার– প্রিন্টার পড়ে থাকতে দেখা যায়। তচনছ করা হয় হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। মারধর করা হয় হাসপাতালের ডিউটি ম্যানেজার-সহ বহুকর্মীদের। ডিউটি ম্যানেজারের অভিযোগ– একসঙ্গে প্রায় শ’খানেক লোক এসে চড়াও হয় আমার উপর। মাটিতে ফেলে আমাকে মারধর করতে থাকে ওরা। তারপর আমার ঘড়ি ও মোবাইল খুঁজে পাচ্ছি না। এতেও থামেনি বিক্ষোভকারীরা। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেই হাসপাতাল চত্বর থেকে ফুলের টব উঁচিয়ে ছুড়ে ফেলতে থাকে কাচের গেটের ওপর। রড চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয় মেইন গেটের একাংশ। মারধর করা হয় হাসপাতালের কর্মীদেরও। ভয়ে কর্মীরা হাসপাতাল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এদিকে হাসপাতালে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করার ফলে অন্যান্য রোগীদেরও সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে। আতঙ্কে চিকিৎসা ছাড়াই অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। এ ছাড়াও দফায় দফায় ডায়মন্ড হারবার রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায় রোগীর পরিবারের লোকজন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে বিশাল পুলিশবাহিনী আসে। নিয়ন্ত্রণে আনতে নামানো হয়র্ যাফও। অন্যদিকে– আপাতত সিএমআরআই হাসপাতালে রোগী ভর্তিও নেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের বক্তব্য– হাসপাতালের ইমারজেন্সি সহ বহু জরুরি জিনিসের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে হাসপাতালে রোগী ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here