২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ‘সাধারণ মানুষ– মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত’ দের কথাই প্রতিফলিত হয়েছে

0
188

কলম প্রতিবেদক ­ বিমুদ্রাকরণের ফাঁস বাজেটের ছত্রে ছত্রে ধরা পড়লেও– তার আঁচ লাগল না রাজ্যবাসীর গায়ে। বরং– নোটবন্দির কোপে কাজ হারানো মানুষজন পেলেন ধাক্কা সামলে নতুন পথের সন্ধান। তাঁদের জন্য করা হল ২৫০ কোটি টাকার তহবিল। কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে বাজেটে ঘোষণা করা হল ১০০ কোটি টাকার আরও একটি তহবিল। অঙ্গনওয়াড়ি থেকে আশাকর্মীদের সাম্মানিক ভাতাও বাড়ল। বাম আমলে করে যাওয়া ঋণ পরিশোধের অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়া সত্ত্বেও কোপ পড়ল না কোনও কন্যাশ্রী– সবুজ সাথী– যুবশ্রী– সংখ্যালঘুদের স্কলারশিপ প্রভৃতি সামাজিক প্রকল্পে। রাজস্বের ভাঁড়ার পূর্ণ করতে লাগু হয়নি কোনও নতুন করের বোঝা। সব মিলিয়ে– শুক্রবার– রাজ্য বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের পেশ করা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ‘সাধারণ মানুষ– মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত’ দের কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। যাকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দেশের মধ্যে সেরা’ বাজেট বলে চিহ্নিত করেছেন।
নোটবন্দি ও ঋণের ফাঁদের মধ্যে কী করে উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছিল এ বারের বাজেটকে কেন্দ্র করে। কারণ– আগামী অর্থবছরেই রাজ্যের কোষাগার থেকে ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে ৪৭ হাজার কোটি টাকা গুনতে হবে । এ দিন পেশ করা বাজেটে তারই উত্তর দিয়েছেন অমিত মিত্র। নোটবন্দির কারণে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কীভাবে ধাক্কা খয়েছে– তা দিয়েই শুরু হয়েছে বাজেট বিবৃতি। বাজেটের বড় অংশ জুড়েই ছিল এর প্রভাব। তা সত্ত্বেও পরিকল্পনাখাতে ব্যয় গত আর্থিক বছরের তুলনায় বাড়িয়ে ৬৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা করা হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও গত ছ-বছরে ১০৩ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে– যা গোটা েদশেই রেকর্ড বলে দাবি অর্থমন্ত্রীর। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় যা সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বা এফআরবিএমের ফলেই সম্ভব হয়েছে। সে কারণে আগামী অর্থবছরে রাজ্যের নিজস্ব কর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৫৫–৭৮৬.৭৪ কোটি টাকা। একইসময়ে রাজ্যের পরিকাঠামো েক্ষত্রকে আরও পোক্ত করার জন্য মূলধনীখাতে ব্যয় বাড়িয়ে ১৫–২১৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯১৮৩.৯০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই– বাজেটে নতুন প্রস্তাব হিসেবে নোটবন্দির জেরে হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক– কারিগর ভিন রাজ্য থেকে বাংলায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন এবং অসহায় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় – ৫০ হাজার কারিগরদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা করে দেবে রাজ্য সরকার বলে েঘাষণা করেন অমিত মিত্র। যার জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ২৫০ কোটি টাকা। রাজ্যের প্রায় ২ লক্ষ অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং ৫০ হাজার ‘আশা’ কর্মীদের ভাতা ৫০০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণাও রয়েছে এই বাজেটে। নোটবন্দির ফল ভুগতে হয়েছে রাজ্যের বিপুল সংখ্যক কৃষককে। এদের বড় ভরসা সমবায় ঋণ। এই ঋণ পরিকাঠামোকে ঢেলে সাজাতে ১০০ কোটি টাকার তহবিল তৈরি করার কথাও এ দিন ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি এও জানান – নোটবন্দি সত্ত্বেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৩ লক্ষ ২৭ হাজার জনের কর্মসংস্থান হয়েছে।
ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধাপ্রাপ্তিও হয়েছে এ বারের রাজ্য বাজেটে। ১০ লক্ষ টাকার বেশি ব্যবসা হলেই এতদিন েছাট ব্যবসায়ীরা ভ্যাটের আওতায় আসতেন। এ বার সেই সীমা বাড়িয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। অফিসে এসে ভ্যাটের নথিপত্র দাখিলের ব্যবস্থা এ বার তুলে দেওয়া হল। এই সরকারের আমলেই েছাটো ব্যবসায়ীদের অডিট রিপোর্ট বার্ষিক ১০ কোটি টাকার ব্যবসা পর্যন্ত করা হয়েছিল। এ বারের বাজেটে ভ্যাট অডিট রিপোর্ট তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ডিলাররা যা যে অডিট রিপোর্ট জাম দেন– তাকেই ভ্যাট অডিট হিসেবে ধরা হবে। এরফলে ৩০ হাজার ছোটো ব্যবসায়ী উপকৃত হবেন। সমস্ত ভ্যাট রিফান্ড চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বের মধ্যেই সম্পূর্ণ হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় এমন ছোট ও মাঝারি উৎপাদন ব্যবসায়ীদের ন্যূনতম ভ্যাট দিলেই হবে বলে জানানো হয়েছে। ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের ক্রেতারা অনেক সময় রেজিস্ট্রেশন করতে দেরি করেন। নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার এক বছরের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করালে রেজিস্ট্রেশন ফিজ-এর ওপরে ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যে রেজিস্ট্রেশন ফি চালু আছে তার সরলীকরণের জন্য ৯ শতাংশ ফিজ কমানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। স্ট্যাম্প ডিউটি ২ শতাংশ করা হয়েছে। ভ্যাটমুক্ত করা হয়েছে শালপাতার থালা– বায়ো ডিজেল– সোলার ওয়াটার হিটার প্রভৃতি দ্রব্যকে।
বাড়ানো হয়েছে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দফতরের বাজেট বরাদ্দও। যার মধ্যে সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা– স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ– পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়নের মতো দফতর রয়েছে। সংখ্যালঘু উন্নয়নের বাজেট ২৫০০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২৮১৫.৬৫ কোটি টাকা করা হয়েছে এই বাজেটে। আগামী বছরেই রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন রয়েছে। েসদিক থেকে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন বিভাগে ১২ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। যা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী এই বাজেটকে েদশের সেরা বললেও তা মানতে চাননি বিরোধীরা। বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বাজেটের নামে কার্যত ধাপ্পা দেওয়া হয়েছে মানুষকে। মানুষকে জাহান্নামে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here