কলকাতায় ফিরবার চেষ্টা করাতেই আকাক্ষাকে খুন করে উদয়ন আমেরিকা না গেলেও সিঙ্গাপুর– ভিয়েতনাম– মস্কোয় গিয়েছিল সিরিয়াল কিলার (পেটে)

0
175

নির্মাল্য সেনগুপ্ত ও কার্তিক ঘোষ
‘কীর্তিমান’ উদয়নের ফন্দিফিকির বুঝতে পেরে বাড়ি ফিরে আসার জন্য রেলের টিকিট কেটে ফেলেছিলেন আকাAক্ষা। পাছে কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যায়– সেই আশঙ্কাতেই প্রেমিকাকে খুন করেছিল উদয়ন। পুলিশি জেরায় ওঠে আসে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। বৃহস্পতিবার বাঁকুড়া জেলা পুলিশ সুপার সুখেন্দু হীরা জানান– ২০১৬ সালের ১২ জুলাই তাঁর প্রেমিকা কলকাতায় ফিরতে নিজের এসবিআই অ্যাকাউন্ট থেকে রেলের টিকিট কেটেছিলেন। তারপরই ওইদিন অর্থাৎ ১২ জুলাই বা তার দু’একদিনের মধ্যেই নিজের প্রেমিকাকে প্রাণে শেষ করে দেয় উদয়ন। পরে প্রমাণ লোপাট করতে ঠান্ডা মাথায় প্রেমিকার দেহ টিনের বাক্সে ভরে তার ওপর সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে পুজোর বেদি তৈরি করে দেয় সে।
কিন্তু আকাAক্ষা শর্মা অন্তর্ধান রহস্যের উন্মোচন হওয়ার পর থেকে উদয়ন পুলিশকে বারংবার জানিয়েছিল আকাAক্ষার একাধিক প্রেমিক ছিল। তাই ত্রিকোণ প্রেমের কারণেই আকাAক্ষাকে খুন করেছে সে। গ্রেফতার হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে পুলিশকে উদয়ন জানিয়েছিল যে– রাজস্থানের এক যুবকের সঙ্গে আকাAক্ষার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মুম্বইবাসী এক যুবকের সঙ্গেও আকাAক্ষার সম্পর্ক ছিল। তখন উদয়ন জানায়– লিভ ইন করলেও দুই রাজ্যের ওই দুই যুবকের সঙ্গেও সমান্তরাল সম্পর্ক চালিয়ে গিয়েছিল আকাAক্ষা। সেই আক্রোশ থেকেই প্রাণে শেষ করে দেবার সিদ্ধান্ত নেয় উদয়ন। সিরিয়াল কিলারের সেই তত্ত্ব পুলিশ খারিজ করে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার পুলিশ সুপার বলছেন– উদয়ন তিনবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। উদয়নের পাসপোর্ট পরীক্ষা করে দেখা গেছে ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর– ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি ভিয়েতনাম এবং ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল মস্কো গিয়েছিলেন উদয়ন। তবে পার্সপোর্টে থাকা আমেরিকার সিল সম্পূর্ণ জাল। উদয়ন কোনও দিনই আমেরিকায় যায়নি। পুলিশি জেরায় উদয়ন স্বীকার করেছে– আকাAক্ষাকে ইউনিসেফের যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠানো হয়েছিল তাও নিজের হাতেই বানিয়েিছল উদয়ন। সেই ভুয়ো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটিও ভোপালের বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে দাবি– উদয়ন এখন অনুতপ্ত। পুলিশের কাছে সে জানিয়েছে– নিজের বাবা-মায়ের শেষকৃত্য করতে চান। এমনকী প্রেমিকার বাবা-মায়ের সঙ্গে সে দেখা করতে চায় উদয়ন।
দিন কয়েক ধরেই পুলিশ চেষ্টা করছিল বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে উদয়নের কাছ থেকে সিরিয়াল কিলিং-এর মোটিভ জানতে। বাঁকুড়ার পুলিশ সুপার সুখেন্দু হীরার নেতৃত্বে বুধবার বিকেলে থেকে রাত পর্যন্ত দফায় দফায় জেরাপর্বের পর– বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জেরা করা হয় উদয়নকে। পুলিশের দাবি উদয়ন জেরায় স্বীকার করেছে তার মা ইন্দ্রাণীদেবীর যাবতীয় গয়না ভোপালের একটি দোকানে বিক্রি করেছে। এ ছাড়াও সিরিয়াল কিলার আকাAক্ষার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকেও সত্তর হাজার টাকা তুলেছে। পুলিশ দু’টি বয়ানই খতিয়ে দেখছে।
অন্যদিকে– গতবছরের জুন মাসে প্রথম নয়। তার আগেও উদয়ন দাসের সাকেতনগরের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন আকাAক্ষা শর্মা। এই তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এর স্বপক্ষে উদয়নের ফ্ল্যাটের দেওয়ালে কয়েকটি লেখা ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। উদয়নের দেওয়ালে লেখাগুলির নীচে রয়েছে আকাAক্ষার নাম। কিন্তু নীল-লাল কালিতে লেখাগুলি আদৌ আকাAক্ষার কি না– তা নিয়েও ধন্দে তদন্তকারীরা। উদ্ধার হয়েছে পাঁচটি লেখা। প্রতিটির নিচে আকাAক্ষা নিজে নাম লিখে রেখেছে। কারণ লেখাগুলিতে উদয়নের প্রশংসা করেছে আকাAক্ষা। পুলিশ সূত্রে খবর– জেরার মুখে উদয়ন স্বীকার করেছে যে মোট ছ’বার তাঁর ফ্ল্যাটে এসেছিল আকাAক্ষা। প্রতিবার তিনি নিজের হাতে দেওয়ালে লিখে রাখতেন। একটি লেখায় গাড়িতে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদয়নকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। আবার অন্যটিতে– ভোপাল শহরের স্মৃতি ধরে রেখেছেন আকাAক্ষা। কিন্তু একটি লেখা সবথেকে বেশি ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। দেওয়ালে লেখা রয়েছে ‘বাই বাই ভোপাল’। আমরা ইন্ডিয়া ছাড়তে চলেছি।’ কিন্তু আমেরিকা যাননি আকাAক্ষা। তাহলে দেওয়ালে কেন তিনি লিখে রাখলেন সেখানে যাওয়ার কথা? সূত্রে খবর– লেখাগুলি পরীক্ষা করবেন তদন্তকারীরা। হাতের লেখা কার? তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে পুলিশের। ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ওই লেখাগুলি উদয়ন নিজে লিখে রেখেছে কি না– তাও খতিয়ে দেখবে পুলিশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here