শেষ দিনে ভিড়ে জমজমাট কলকাতা বইমেলা

0
152

গোলাম রাশিদ
পড়ন্ত বিকেল। রোদের তেজ অন্য দিনের থেকে একটু বেশিই। তবে রোদ কিংবা বাইপাসের জ্যাম– কোনও কিছুই বাধ সাধতে পারেনি বইপ্রেমীদের উৎসাহে। বেলা গড়াতেই চোখে সানগ্লাস আর মাথায় হরেকরকম টুপি পরে হাজির বারো থেকে সত্তরের বইপোকারা। রবিবার ছুটির দিন এবং ৪১তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার শেষ দিন। তাই এখনও যাদের একবারও ঢুঁ মারা হয়নি মিলনমেলা প্রাঙ্গণে– তাদের শেষ মুহূর্তের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে আসা ওয়াশিম রহমান ও মাহমুদা রহমানের কথায়– আগে থেকেই আসার ইচ্ছে ছিল বইমেলায়। আজ সময় পেলাম। তবে এত ভিড় হবে কল্পনাই করতে পারিনি। ইসলামি বইয়ের স্টলগুলো খুঁজে পাওয়াই মুশকিল ছোট্ট প্যাভিলয়নের এই ভিড়ে। একই অভিযোগ আদি মল্লিক ব্রাদার্স-এর কর্ণধার আবদুস সালাম মল্লিকেরও। তাঁর দাবি– ছোট প্রকাশনাগুলোকে একই অপরিসর প্যাভিলিয়নের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে ব্যবসার ক্ষতি করা হল। বহুজন বইমেলায় এসে স্টল খুঁজে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আর সবাই বই কিনতেও আসছে না। ঘুরে চলে যাচ্ছে। অনলাইন কেনাকাটার যুগ এখন।

বিশ্ববঙ্গীয় প্রকাশনের কর্মীদের আবার অন্য অভিযোগ। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দেওয়া স্টলগুলি থেকে কানফাটানো আওয়াজে নাকি কান পাতা দায়। বইয়ের দোকানের বদলে ভিড় বাড়ছে সেখানে। আর নোটবন্দির কোপ পড়েছে কলকাতা বইমেলাতেও। জানালেন হরফ প্রকাশনীর এক বিক্রেতাকর্মী। ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের ফলে খুচরো ব্যবসা মার খাচ্ছে। সাধ আর সাধ্যের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছে না মধ্যবিত্ত পাঠক। তবু আবদুল আজিজ আলআমানের সুলিখিত নবীজীবনী ‘তখন মাক্কামদিনায়’– ‘চার খলিফার জীবনকথা’ দেদার বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরির ‘জাতীয়তাবাদ– সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’ বইটি প্রকাশ করেছে বিশ্ববঙ্গীয় প্রকাশন। ৮২৪ পৃষ্ঠা ও ৮০০ টাকা মূল্যের এই বইটি বইমেলার শেষদিনে ৩৫ শতাংশ ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে। আগের দিনগুলোতেও বইটি কিনেছেন অনেক উৎসাহী পাঠক। বাংলাদেশের ইসলামি বইয়ের উদ্দেশ্যে ইসলামিক বুক সেন্টার ও তালীম প্রকাশনীতে ভিড় ছিল যথেষ্ট। রসূলুল্লাহর সা. জীবনী– কুরআনের বাংলা অনুবাদ– হাদিস থেকে নসিম হেজাজীর উপন্যাস– সবই পাওয়া যাচ্ছে ইসলামিক বুক সেন্টারের এই স্টলে।
ইসলামি বইয়ের স্টলগুলোর পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে ছিল অকল্পনীয় পাঠক সমাবেশ। তরুণ কবি-লেখকরা বই থেকে আবৃত্তি করে শোনাচ্ছিলেন নিজেদের লেখা কবিতা। মু? পাঠক– লেখকের সমন্বয়ে যেন এক মুক্তমঞ্চ। রক্তমাংস– লালপরি নীলপরি– বিজ্ঞান অন্বেষক– বেরিয়ে পড়ি ইত্যাদি লিটল ম্যাগাজিন স্টলের বিক্রেতাদের চোখেমুখে শেষ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি। ছুটির দিনগুলোতে এমনিতেই মেলায় পা ফেলা যায় না– তার উপর আজ শেষ দিন। তাই লোক প্রচুর। তবে সে তুলনায় লিটল ম্যাগাজিন বিক্রি হচ্ছে না। বলছিলেন ভাঙড় থেকে আসা এক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক। তাঁর মতে– নিজেদের চেনা বৃত্তের বাইরে কেউ ভালো ম্যাগাজিন কিনে পড়ছে না। সবাই স্যোশাল মিডিয়ায় বড্ড ব্যস্ত। এ দিকে প্যাভিলিয়নে টেবিল না পাওয়া ‘অর্ধেক আকাশ’ পত্রিকাটি খোলা আকাশের নীচে আসন পেতে বিক্রি শুরু করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে অন্যান্যদের।
তবে ২০০ টাকায় এক ব্যাগ বই– ফিফটি পার্সেন্ট ছাড়ে আনন্দ– দেজের বই– পঞ্চাশ টাকায় গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি– এত ভিড়ে ফিরব কী করে এইসব চিলচিৎকার আর গুঞ্জন ছাড়িয়ে মিলনমেলায় বেজে উঠেছে বিদায়ের করুণ সানাই। লেখক-পাঠক-প্রকাশক সবারই মনে যেন বিষ]তার ছায়া। আবার অপেক্ষা– পরবর্তী বছরের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here