দাড়ি রেখে ভালো খেলছিলাম– তাই কাটিনিঃ মেসি

0
160

লিওনেল মেসি নামটা শুনলেই অসাধারণ সব চিত্র চোখে ভেসে ওঠে। কখনও ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে বল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া তো কখনও আবার গোলরক্ষককে পরাস্ত করে গোলে বল জড়িয়ে দেও। কোনও সন্দেহ নেই– এই মেসি হলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। আর্জেন্টিনার হয়ে বিরাট বড় মাপের কোনও সাফল্য না পেলেও ক্লাবের আঙিনায় বার্সেলোনার হয়ে পেয়েছেন প্রায় সব ট্রফিই। অনেকেই তাঁকে পেলে কিংবা মারাদোনার থেকেও এগিয়ে রেখে সবার সেরার তকমা দেয়। সেই লিওনেল মেসি ফুটবলের বাইরে তার জীবনের বিশেষ কয়েকটি দিক নিয়ে হাজির হলেন মিশরীয় একটি টিভি চ্যানেলের সামনে। সেখানে বিশ্বের এই সেরা ফুটবলারটি শুধু ফুটবলের নয়– মাঠের বাইরের অনেকে অজানা কাহিনি তুলে ধরেন।
প্রশ্ন­ অনেক সমাসেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন আপনি– আপনার নিজেরই মেসি ফাউন্ডেশন আছে। এ ছাড়া আপনি মিশরে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়েরû সঙ্গেও যুক্ত। এই কাজটি সম্পর্কে আমাদের বলুন।
মেসি­ এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় এবং এই কাজেরû সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে আমারও খুব ভালো লাগছে। হেপাটাইটিসে আক্রান্তদের সংখ্যা কমিয়ে নিয়ে আসতে এই ক্যাম্পেইনটি খুব বড় ভূমিকা রাখছে। পুরো কার্যক্রমে আমি খুশি।

প্রশ্ন­ প্রতিদিনের জয়-পরাজয়ের চাপ কখনও কি ক্লান্ত করে দেয় না? যখন হারেন তখন নিজেকে কীভাবে সামাল দেন?
মেসি­ খেলাটাই এমন যে প্রতিনিয়তই লক্ষ্য অর্জনের পিছনে ছুটতে হবে। অনেক ভালো দল আছে এবং তাদের সঙ্গে খেলাটা সবসময় সহজ নয়। কখনও হারতে হয়– কখনও জয়। যখন বয়স কম ছিল তখনকার তুলনায় এখন হারগুলোকে সহজে মেনে নিতে পারি। এখন বুঝি এই খেলাটাই এমন– আপনি কখনও জিতবেন– কখনও হারবেন।

প্রশ্ন­ মানুষ যখন হারের দায়ভার আপনার উপর চাপিয়ে দেয়– সেটা কি আপনাকে কষ্ট দেয় না? সবাই যখন বলে ‘আজকে মেসি গোল করতে পারেনি’ বা ‘মেসি আজকে ভালো খেলেনি’ এসব কথা মন খারাপ করে দেয় না?
মেসি­ না– মোটেই না। মিডিয়া বা এসব সমালোচনা সয়ে গেছে। আগেই বলেছি আমি দলীয় লক্ষ্যগুলোই পূরণের চেষ্টা করি। আমার পক্ষে যতটা সম্ভব সেরাটা করি– এরপরেও অনেক সময় এতে কাজ হয় না– তখন শান্ত থাকার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন­ তাহলে বলতে চাইছেন আলোচনা কিংবা সমালোচনা কিছুই আপনাকে প্রভাবিত করে না?
মেসি­ হ্যাঁ– সেটাই। এতদিন এই পেশাদারি ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে থেকে শিখেছি কীভাবে মিডিয়া– সমালোচনাকে সামলাতে হয়। সবচেয়ে ভালো হল এসব থেকে দূরে থাকা– ভালো বা মন্দ যাই বলুক না কেন।

প্রশ্ন­ ইন্টারনেট খুললেই দেখা যায় মেসি বনাম অন্য কোনও ফুটবলারের পরিসংখ্যান নিয়ে তুলনা হচ্ছে। এসবে কি বিব্রত হন?
মেসি­ না– আমার কাছে মনে হয় প্রত্যেকেই আলাদা। আমি প্রতিনিয়ত উন্নতি করতে চাই– দলের লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখতে চাই। আমার মনে হয় সব প্লেয়াররাই এভাবেই দেখে ব্যাপারটা। তুলনা করে বাইরের মানুষজন– প্লেয়াররা সেভাবে এসব আমল দেয় না।

প্রশ্ন­ অনেকেই জানতে চান আপনার ফ্রি-কিকের রহস্য কী– কীভাবে এমন অসাধারণ গোল করেন? এগুলো কি অনেক প্র্যাকটিসের ফসল নাকি স্বাভাবিকভাবেই করতে পারেন?
মেসি­ এজন্য আলাদা কোনও প্র্যাকটিস করি না– সাধারণ প্র্যাকটিসই করি। সকালে ট্রেনিংয়ে যাই– কখনও সারাদিন ট্রেনিং করতে হয়। ম্যাচের সূচি অনুযায়ী নির্ধারিত হয় কতক্ষণ ট্রেনিং করব। আলাদাভাবে ফ্রি-কিক প্র্যাকটিস সেভাবে করা হয় না। ট্রেনিং শেষে বাড়ি ফিরি– ছেলেকে স্কুল থেকে আনি– পরিবারের সঙ্গে ডিনার করি। অন্যসব সাধারণ মানুষের মতোই দিনটা কাটে ।

প্রশ্ন­ আপনি কি পরে আপনার ম্যাচগুলো আবার দেখেন?
মেসি­ খুব একটা দেখা হয় না– হঠাৎ হয়তো দেখি। আসলে আমাদের সেভাবে সময় থাকে না। আমাদের অনেক ম্যাচ খেলতে হয়– অবসর সময় পাওয়া যায় খুব অল্প। মাঝেমধ্যে যখন বিশেষ ম্যাচ হয়– হাতে সময় থাকে– তখন দেখা হয়। এমনিতে দেখি না।

প্রশ্ন­ আপনি এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। যখন প্রথম বার্সায় এসেছিলেন এমন কিছু চিন্তা করেছিলেন?
মেসি­ না– বার্সায় আসার সময় এমন কিছু চিন্তাও করিনি। শুধু একটাই স্বপ্ন ছিল প্রথম একাদশের হয়ে খেলব– পেশাদার ফুটবলার হব। আসার পর থেকে আমি অনেক স্বপ্নকেই বাস্তবে দেখতে পেয়েছি। তবে এই জায়গায় পৌঁছে যাব– সেটা কল্পনাও করিনি।

প্রশ্ন­ আপনি বলেছিলেন যখন আর উপভোগ করবেন না ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে নেবেন। আপনার মতে অবসরের সঠিক বয়স কোনটা?
মেসি­ আসলে ব্যাপারটা তেমন না। আপনি কোনও নির্দিষ্ট বয়স বলতে পারেন না– আমি পেশাদার ফুটবল ছেড়ে দিলেও তখন কোথাও না কোথাও ফুটবল খেলে যাব। সুযোগ পেলেই খেলব। ছোট্ট বয়স থেকেই এই খেলাটার সঙ্গে ভালোবাসা– আবেগ জড়িয়ে– যতদিন খেলতে পারব খেলব।

প্রশ্ন­ তারপরও আপনার কাছে কোন বয়সটাকে মনে হয় অবসর নেওয়ার সময়?
মেসি­ শরীরই সেটা বলে দেবে। একটা সময় এসে বলবে এবার থামা উচিত। পেশাদার ফুটবলে ফিজিক্যালিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্লেয়ারের ক্ষেত্রে একেক সময়– প্রত্যেকের জন্যই আলাদা।

প্রশ্ন­ আপনাকে অনেক বাজে ফাউলের স্বীকার হতে হয়– এটা আপনাকে বিরক্ত করে না?
মেসি­ না– এটাই স্বাভাবিক। যখন প্রতিপক্ষ ফেলে দেবে– তখনও মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। আর রেফারি যদি আপনার পক্ষে সিদ্ধান্ত না দেয়– মেনে নিতেই হবে। এটাই ফুটবলের নিয়ম।

প্রশ্ন­ এই দাড়ির পিছনের কারণটা কি? সৌভাগ্যের জন্য বা অন্য কোনও কারণে?
মেসি­ তেমন নির্দিষ্ট কোনও কারণ নেই। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্টেÉ ছিলাম– আমার মুখে দাড়ি ছিল– আমরা ভালোও খেলছিলাম– তাই শেষপর্যন্ত দাড়ি না কেটে রেখেই দিই। আগের থেকে কোনও চিন্তাভাবনা করে রাখিনি।

প্রশ্ন­ আপনি কি জানেন– আপনার ভক্তরা আপনার চুলের স্টাইল– দাড়ি সব অবিকল নকল করে?
মেসি­ তাই নাকি– আমার জানা ছিল না। এটা শুনে ভালোই লাগল। তবে সবাই একই চুলের স্টাইল আর দাড়ি রাখলে! (হাসি)।

প্রশ্ন­ তরুণ প্রজন্ম আপনার স্টাইল অনুকরণ করছে– এটা কি আপনার ওপর বাড়তি দায়িত্ব?
মেসি­ আমি ভাবতেও পারিনি এই স্টাইল প্রভাবিত করতে পারে। আমি এভাবে ভাবি না। অনেকেই আমাকে দেখে– আমার মতো স্টাইল অনুকরণ করে হয়তো। তবে আমি সবসময় নিজের ব্যক্তিত্বেরû সঙ্গে মানানসই কিছু করার চেষ্টা করি। আমি আমার মতোই থাকতে চাই।

প্রশ্ন­ অনেক খেলোয়াড়ই– যেমন জিদান অবসরের পর কোচ হয়েছেন। আপনার কি এমন কোনও চিন্তা-ভাবনা আছে?
মেসি­ আমি সত্যিই জানি না। এই মুহূর্তে আমি কোচিং কেরিয়ার নিয়ে ভাবছিও না বা এই নিয়ে চিন্তিতও নই। হয়তো অবসরের কয়েক বছর পর আমি কোচিং করানোর কথা ভাবব। এখন আমি খেলাটাকেই উপভোগ করতে চাইছি এবং এসব নিয়ে ভাবতে চাইছি না। কারণ নিজেও জানি না– ভবিষ্যতে কি হবে।

প্রশ্ন­ আপনি অনেক প্লেস্টেশন গেমেই আছেন। গেমে নিজের পারফরমেন্সে কি সন্তুষ্ট?
মেসি­ গেমে অনেক কিছুই করা সম্ভব– যা বাস্তবে করাটা অনেকটাই অসম্ভব।

প্রশ্ন­ তাহলে প্লেস্টেশন কি সহজ না কঠিন বলবেন?
মেসি­ আমি বলতে চাইছি প্লেস্টেশনে আপনি বাস্তব ফুটবলের চেয়ে অনেক বেশি কিছু করতে পারেন।

প্রশ্ন­ এমন কোনও ম্যাচ আছে যেটাকে নিজের সবচেয়ে খারাপ ম্যাচ হিসেবে মনে রেখেছেন? না খারাপ হারগুলোকে ভুলে থাকতে পছন্দ করেন?
মেসি­ অনেক হতাশাজনক ম্যাচই আছে– সব ম্যাচ তো জিততে পারিনি। সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার হয়ে পর পর তিনটে ফাইনাল হার খুব মন খারাপ করে দেয়। আমরা দারুণ কিছু করে দেখাতে চেয়েছিলাম– খুব কাছে এসেও পারিনি।

প্রশ্ন­ আপনার অবসরের ঘোষণা শুনে পুরো বিশ্ব কষ্ট পেয়েছিল। তবে যখন আপনি ফেরার ঘোষণা করেন সবাই খুশি হয়েছে। আপনি নিজে খুশি এই সিদ্ধান্তে?
মেসি­ অবশ্যই– আমি খুব খুশি। আসলে আমরা এত ভালো খেলার পরও টুর্নামেন্ট জিততে না পারাটা খুব হতাশ করেছিল।

প্রশ্ন­ আপনি নিশ্চয় জানেন যে– আপনার ফেরার সিদ্ধান্ত সবাইকে কতটা স্বস্তি দিয়েছে?
মেসি­ আসলে সমর্থকদের জন্যও হারটা সহজ ছিল না। তারাও আমাদের মতো বিশেষ কিছু পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। তারাও বেশ হতাশ হয়েছে।

প্রশ্ন­ যেকোনও সাক্ষাৎকারেই আপনি কোনও প্রশ্নটা আশা করেন আপনাকে করা হবে– কিন্তু কেউ কখনও সেই প্রশ্নটা করে না?
মেসি­ আমি জানি না। আমি অনেক সাক্ষাৎকার দিয়েছি– সবাই আমার ব্যাপারে কম বেশি সবকিছুই জানে। আমি খুব সাধারণ থাকতে পছন্দ করি– আমি সরাসরি বলতেই পছন্দ করি। সবাই জানে আমি কেমন– নতুন করে খুব বেশি বলার কিছু নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here